ঢাকাঃ বাংলাদেশের আকাশপথে আমদানি-রফতানির মূল কেন্দ্র হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যেখানে প্রতি বছর গড়ে ২.১০ লাখ মেট্রিক টন রফতানি ও ১.২১ লাখ মেট্রিক টন আমদানি পণ্য পরিবহন করে থাকে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের শাহ আমানত থেকে রফতানি হয় মাত্র ৩,৩৫২ ও আমদানি ২,৯২০ মেট্রিক টন।
বিমান সূত্র জানায়, দেশের আকাশপথের বাণিজ্য কার্যক্রম প্রায় পুরোটাই ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হলেও কিছু পণ্য সড়ক পথে ভারতে পরিবহন করে সেখান থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট করা হতো।
কিন্তু ভারত আকস্মিকভাবে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। কিন্তু এই সংকটকেই সুযোগে পরিণত করে এগিয়ে আসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র রওশন কবীর জানান, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল এভিয়েশন ও রপ্তানিকারকদের যৌথ প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে।
বিমানবন্দরটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের RA3 সার্টিফিকেশন পেয়েছে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সিলেট থেকে স্পেনের জারাগোজায় প্রথম ফ্রেইটার ফ্লাইট চালু হয়। মে মাসে সপ্তাহে ১টি করে ফ্লাইট পরিচালিত হয়, আর জুন থেকে তা সপ্তাহে ২টিতে উন্নীত হচ্ছে। ভবিষ্যতে সপ্তাহে ৪টি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমানের মুখপাত্র জানান, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে কার্গো ফ্রেইটার চালুর প্রস্তুতি চলছে, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। একইসাথে, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে দেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। উন্নত রানওয়ে, ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথ ও চট্টগ্রাম থেকে স্বল্প দূরত্বের ফলে এখান থেকে কম খরচে কার্গো পরিবহন সম্ভব। এজন্য জনবল, কার্গো ওয়্যারহাউজ ও হ্যান্ডলিং সরঞ্জামের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
বিমান সূত্র জানায়, ঢাকার নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর অপেক্ষায় রয়েছে, যা চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বাড়বে। ২০১৯ সালে যেখানে কার্গো পরিবহন (আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ )ছিল ৩.৩৪ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে ২০২৫ সালে ৪.৩৪ লাখ এবং ২০৩৫ সালে ৬.৬৩ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছবে।
কার্গো পরিচালনার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ইতোমধ্যে জনবল, অবকাঠামো ও ৩৮১টি আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমানের কার্গো বিভাগ রেকর্ড আয় করেছে।
এছাড়া, বিমান RA3 ও ACC3 সার্টিফিকেশন অর্জন করে ইউরোপীয় বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত কার্গো পরিবহনে সক্ষমতা দেখিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, নতুন কার্গো টার্মিনালের জন্য ৩৩৫টি হাইড্রোলিক হ্যান্ড ট্রলি, ৮টি টো ট্রাক্টর, ১৮টি মিনি ফর্ক লিফট, ১৪টি ফর্ক লিফট এবং ৬টি বাগিসহ মোট ৩৮১টি আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংযোজন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যার মধ্যে সিংহভাগ সরঞ্জাম ইতোমধ্যে সংযোজিত হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৪৮টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের নির্ধারিত কার্গো হ্যান্ডলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে এবং প্রতি বছর গড়ে ২,১০০টি নন-শিডিউল কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, এমিরাটস, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, রয়েল ডাচ এয়ার, এয়ার ফ্রান্সসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য এয়ারলাইনসের সঙ্গে SPA, BSA, কোড-শেয়ারিং ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গঠনে কাজ করছে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কার্গো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পরিবহন ক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং উন্নতমানের সেবা প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা হয়ে ট্রানজিট/ট্রান্সফার কার্গো পরিবহনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।
তিনি আরও বলেন, সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার যে সাহস, নেতৃত্ব এবং নিরলস প্রয়াস প্রয়োজন, তা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রমাণ করেছে।
আকাশপথে বাংলাদেশের কার্গো পরিবহন খাতে এই প্রগতির পেছনে বিমান শুধু একজন অংশীদার নয়—এক নির্ভরযোগ্য অগ্রদূত। কার্গো এখন কেবল পরিবহন সেবা নয়, এটি দেশের স্বপ্ন, গর্ব ও বিশ্বজয়ের প্রতীক। আর সেই প্রতীকে নতুন ডানা যোগ করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
-B