ট্রাম্পের শুল্ক-নীতিতে ফের চাঙ্গা বোয়িং

-মনিটর ডেস্ক রিপোর্ট Date: 03 August, 2025
ট্রাম্পের শুল্ক-নীতিতে ফের চাঙ্গা বোয়িং

ঢাকাঃ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মাঝ আকাশে বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স ৯ মডেলের একটি উড়োজাহাজের ডোর-প্লাগ খুলে পড়ে যায়। গত বছরের শেষ দিকে ধর্মঘটে নামে কোম্পানিটির কর্মীরা। বোয়িংয়ের মুনাফায়ও দেখা যায় বড়সড় পতন। পরিবর্তন আসে কোম্পানির শীর্ষ নেতৃত্বেও।

সর্বশেষ এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনায় বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ নিয়েও ওঠে অনেক বিতর্ক। সব মিলিয়ে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বেশ খারাপ সময় পার করছিল মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানিটি। অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক পরিস্থিতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়েও তৈরি হয়েছিল সংশয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একাধিক বাধায় কয়েক বছরে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এভিয়েশন খাতের সরবরাহ চেইন। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে উড়োজাহাজের কারিগরি ও প্রকৌশলগত দিকগুলোও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েছে শীর্ষ উড়োজাহাজ উৎপাদন কোম্পানি বোয়িং। কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়েই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। তবে সে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি। একের পর এক উড়োজাহাজ সরবরাহের ক্রয়াদেশ পাচ্ছে বোয়িং। কোম্পানিটির বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনা করা হচ্ছে নতুন করে টেক অফ বা উড্ডয়নের সঙ্গে।

যুক্তরাষ্ট্রে রফতানীকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক সুনির্দিষ্ট করার পাশাপাশি জ্বালানি ও খাদ্যসহ অন্যান্য মার্কিন পণ্য ক্রয় এবং বিনিয়োগের শর্ত দিয়ে বিভিন্ন দেশকে বাণিজ্য চুক্তি সইয়ে সম্মত করাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে শুধু এশিয়া থেকেই ১৭৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বোয়িং। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে জাপান থেকে, ১০০টি। এরপর ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ থেকে যথাক্রমে ৫০টি ও ২৫টি।

গবেষণা সংস্থা সিএফআরএ রিসার্চের বিশ্লেষক ম্যাথিউ মিলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা দেশগুলো এখন একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি সৃষ্ট ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করতে চায় তারা। তাই সদিচ্ছার বার্তা দিতে বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো।

দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর মধ্যপ্রাচ্য দিয়েই বিদেশ সফর শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মে মাসে ওই সফরে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পান তিনি। ওই সময় বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে চুক্তি হয় যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে শুধু কাতার থেকেই উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি এসেছে দুই শতাধিক, যার মধ্যে দেড়শ ওয়াইড-বডি জেট সংগ্রহ করবে কাতার এয়ারওয়েজ। ওই সফরে উপস্থিত ছিলেন বোয়িংয়ের সিইও কেলি ওর্টবার্গ।

গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো চলতি বছর বোয়িংয়ের ওপর শুল্কজনিত প্রভাব পূর্বাভাসের তুলনায় কমিয়ে আনতে পারে।

এ ধরনের ক্রয় চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে নতুন নয় বলে জানিয়েছেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটল কাউন্সেলের বাণিজ্যনীতি বিশেষজ্ঞ ব্রুস হার্শ। তার মতে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের প্রথম মেয়াদ থেকেই বাণিজ্য চুক্তিগুলোয় এমন ক্রয় চুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে আসছেন। মার্কিন বাণিজ্য অংশীদাররাও এটা জানে। তাই তারা সাধারণত বড় অংকের পণ্যগুলোই বেছে নেয়।’

জুনে বোয়িং নতুন ক্রয়াদেশ পেয়েছে ১১৬টি। বিষয়টিকে কোম্পানিটির জন্য স্বস্তিকর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের উৎস এবং সেখানকার অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানও। নতুন ক্রয়াদেশগুলো পুঁজিবাজারে বোয়িংয়ের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে। চলতি বছরে বাজারে বোয়িংয়ের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

তবে নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এভিয়েশন খাতের কিছু বিশ্লেষক ক্রয়াদেশ প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মার্কিন বাণিজ্য আলোচকদের হয়তো বোয়িং কিনতে জোর করার প্রয়োজন পড়েনি। কারণ কেউ হুট করে উড়োজাহাজ কেনে না। এমনকি সরকারি এয়ারলাইনস সংস্থাগুলোও মাসের পর মাস সময় নিয়ে ব্যয়বহুল ক্রয় পরিকল্পনা করে। এছাড়া বড় উড়োজাহাজ সরবরাহকারী হিসেবে বোয়িংয়ের সামনে ফ্রান্সের এয়ারবাস ছাড়া তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এয়ারবাস নিজেও সরবরাহ চেইন সংকটে ভুগছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ভবিষ্যতে আরো ক্রয়াদেশ পেতে পারে বোয়িং। উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। বোয়িংয়ের শিডিউল বুক দ্রুত পূর্ণ হতে থাকায় এখনো ক্রয়াদেশ না দেয়া অনেক সংস্থা চাপ অনুভব করবে। কারণ এখনই ক্রয়াদেশ না দিলে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের সময় অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

অবশ্য উড়োজাহাজ খাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অভিতাসের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পিলারস্কি এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, এসব ক্রয়াদেশকে যতটা বড় মনে হচ্ছে, সম্ভবত ততটা নয়। কারণ চুক্তি সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসন, অংশীদার দেশ ও বোয়িং কর্তৃপক্ষ খুব অল্প তথ্য প্রকাশ করেছে। কিছু চুক্তি এখনো আলোচনা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ৫০টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছে ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু এক ইন্দোনেশীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনস গারুড়া ও বোয়িংয়ের মধ্যে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

অনেকগুলো ক্ষেত্রে হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ছাড়াই বোয়িং নতুন উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ পেত বলে মন্তব্য করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। মে মাসে কাতার এয়ারওয়েজ বোয়িং থেকে ১৫০ ওয়াইড-বডি জেট কেনার ঘোষণা দেয়। এ বিষয়ে ভিজুয়াল অ্যাপ্রোচ অ্যানালাইটিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোর্টনি মিলার বলেন, ‘চুক্তি যেভাবেই হোক হতো। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের সময়সীমার সঙ্গে মিল রাখতে গিয়ে হয়তো কিছুটা এগিয়ে আনা হয়েছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু চুক্তি সত্যিকার অর্থে ট্রাম্প সৃষ্ট চাপের ফল হতে পারে। তা সত্ত্বেও ডেলিভারির সময় আসা পর্যন্ত অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। বর্তমানে বোয়িং ও এয়ারবাসের হাতে হাজার হাজার ক্রয়াদেশ রয়েছে, যা সম্পন্ন হতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে লোকসান মেনে নিয়েও অনেক সংস্থা চুক্তি বাতিল, ডেলিভারি পিছিয়ে দেয়ার বা ক্রয়াদেশ কমানোর অনুরোধ করতে পারে।

তবে নতুন ক্রয়াদেশগুলোকে মুনাফায় পরিণত করতে বোয়িংকে বেশকিছু সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে। সংস্থাটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মডেলের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়নি। সাত-আট বছর আগের দুটি ৭৩৭ ম্যাক্স দুর্ঘটনার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি কোম্পানিটি। ২০২৪ সালের আর্থিক ক্ষতির প্রভাবও কাটেনি। এমনকি ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কবিবাদ বোয়িংয়ের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor