ঢাকাঃ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপ বোনাইয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করতে নেদারল্যান্ডস সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত।
একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর গতি আরো বাড়াতে এবং এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরির আদেশ দেয়া হয়েছে। গত বুধবার হেগের জেলা আদালত এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।
বোনাইয়ার ৮ বাসিন্দা এবং পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের করা এক মামলার প্রেক্ষিতে এ রায় এলো।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বোনাইরের মানুষের জন্য ডাচ সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে না, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আদালত এই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন এবং সরকারের বর্তমান জলবায়ু নীতিকে অপ্রতুল ও বৈষম্যমূলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বোনাইয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক জয়
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, নেদারল্যান্ডসের মূল ভূখণ্ডের নাগরিকদের তুলনায় বোনাইয়ার বাসিন্দারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে বোনাইয়া নেদারল্যান্ডসের একটি বিশেষ পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও দ্বীপটির সুরক্ষায় কোনো কার্যকর অভিযোজন পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম দাবদাহ এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্বীপটির অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, বোনাইয়ার মানুষের জীবন ও পারিবারিক অধিকার রক্ষা করা সরকারের আইনি দায়িত্ব। যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী। মামলার অন্যতম বাদী ও বোনাইয়ার বাসিন্দা অনি এমেরেন্সিয়ানা বলেন, "আদালত আজ আমাদের কথা শুনেছেন। রাষ্ট্র আর আমাদের উপেক্ষা করতে পারবে না।"
কার্বন নিঃসরণ কমানোর কঠোর নির্দেশ
আদালত শুধু বোনাইয়ার সুরক্ষা নয়, বরং পুরো নেদারল্যান্ডসের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারকে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে অর্থনীতি-ব্যাপী নিঃসরণ কমানোর জন্য একটি আইনত বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
বিচারক উল্লেখ করেন, নেদারল্যান্ডসের বর্তমান ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাধ্যতামূলক নয় এবং তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম। বিশেষ করে উড়োজাহাজ ও জাহাজ চলাচলের ফলে সৃষ্ট দূষণ এই পরিকল্পনায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞরা এই রায়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। এটিই প্রথম কোনো মামলা যেখানে একটি দেশের আদালত তাদের কোনো সমুদ্রপারবর্তী অঞ্চলের জন্য সুনির্দিষ্ট জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিলেন। এই রায় বিশ্বের অন্যান্য ধনী দেশগুলোর ওপরও চাপ তৈরি করবে, যাদের অনেক সমুদ্রপারবর্তী অঞ্চল বা দ্বীপ রয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নেদারল্যান্ডসের জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী সোফি হারম্যানস বলেন, সরকার এই রায়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে। বোনাইয়া ও মূল ভূখণ্ড—উভয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্যই এই রায় তাৎপর্যপূর্ণ বলে তিনি স্বীকার করেন। গ্রিনপিস এই জয়কে জলবায়ু ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
-B