পর্যটক-দর্শনার্থীতে লোকারণ্য কক্সবাজার, ৫০০ কোটির বাণিজ্যের আশা

জাফর আলম, কক্সবাজার Date: 22 December, 2025
পর্যটক-দর্শনার্থীতে লোকারণ্য কক্সবাজার, ৫০০ কোটির বাণিজ্যের আশা

কক্সবাজার: দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পর্যটকে লোকারণ্য হয়ে আছে সৈকততীর ও পর্যটন স্পটগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থার্টিফাস্ট নাইটের পরবর্তী সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ থেকে দশ লাখ পর্যটকের উপস্থিতি আশা করা যাচ্ছে। এ সময়ে স্থানীয় পর্যটন শিল্পে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ব্যবসা আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভিড় রয়েছে হোটেল-মোটেল জোনের অলিগলি ও রাস্তায়। পর্যটকবাহী ও সাধারণ পরিবহন এবং ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশায় বাইবাস সড়ক, কলাতলী ডলফিন মোড়, হোটেল-মোটেল জোন, লাবণী-শৈবাল সড়ক সবখানেই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নাকাল হচ্ছেন পর্যটকরা। 

টইটম্বুর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশও। মাঠে টহল দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো।

ব্যবসায়ী সূত্র জানায়, পরীক্ষার পরের সময়ের পরিকল্পনায় ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আগমন ঘটছে। এখনো সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সপ্তাহ-পক্ষকাল আগে থেকেই আগাম বুকিং হয়ে আছে পর্যটনকেন্দ্রিক সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ।

হোটেল মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউসের ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান বলেন, মৌসুমে কমবেশি পর্যটক নিত্যদিন কক্সবাজারে অবস্থান করেন। কিন্তু বিজয় দিবসের ছুটি ও পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসছেন ভ্রমণপ্রেমীরা।

কক্সবাজার টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, শুধু কক্সবাজার নয়, ইনানী-হিমছড়ি, সেন্টমার্টিনসহ সব পর্যটন স্পটে পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে। আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সেন্টমার্টিন নৌরুটে চলাচল করা সাতটি পর্যটকবাহী জাহাজের টিকিট আগাম বুকিং হয়ে আছে।

কলাতলীর সি নাইট গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, এখনো অতীতের মতো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোকজন আসেনি। তবে মন্দা সময়ের চেয়ে ভালোই পর্যটক উপস্থিতি রয়েছে। এটা চলমান থাকলে অতীতের লোকসান পোষানো সম্ভব।

সৈকতের সি সেইফ লাইফ গার্ডের সিনিয়র কর্মী মোহাম্মদ ওসমান বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই উল্লেখ করার মতো পর্যটক সকাল থেকেই ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলমান থাকে এ আনন্দ। হঠাৎ বিশাল পানির রথে আত্মহারা হয়ে অনেকে বিপৎসীমার বাইরেও চলে যান। তাদের কিনারায় আনতে কাজ করার পাশাপাশি নিরাপদ থাকতে বারবার সতর্ক করেন আমাদের (লাইফগার্ড) কর্মীরা।

কক্সবাজার হোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটন জোনে ৫ শতাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় লাখ পর্যটক থাকার ব্যবস্থা হয়। বিজয় দিবসের ছুটির পর থেকে কক্সবাজারে লোকসমাগম বেড়েছে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেক হোটেল-মোটেলে আগাম বুকিং আছে। বছরের শেষ দিকে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের সঙ্গে সাপ্তাহিক মিলিয়ে টানা ছুটি থাকছে। এতে সরকারি কর্মজীবীরাও বেড়াতে আসবেন। এসময় পর্যটকের চাপ আরও বাড়বে। বছরের শেষ ও আগামী বছরের শুরুতে কক্সবাজারে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটতে পারে। এতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। 

সমিতির তালিকাভুক্ত কোনো হোটেল যেন অতিরিক্ত ভাড়া না নেয় সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে আছে, আমরা তাদের সহযোগিতা করছি।

পর্যটকের ভিড়ে খুশি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, স্যুভেনির দোকান ও সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হোটেল-মোটেল জোন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বছরের শেষ দিন ও নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। অনেকে ইতোমধ্যে নতুন বছর উদযাপনের জন্য কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছেন।

সব মিলিয়ে শীতের এই মৌসুমে পর্যটকের ঢলে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। নিরাপত্তা, আবাসন ও সেবার মান বজায় থাকলে পর্যটন শিল্পে এ ধারা আরও গতিশীল হবে- এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়ন প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, মৌসুমের শুরু থেকেই পর্যটক হয়রানি রোধে বাড়তি তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি। অভিযোগ পেলেই গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত হেল্পলাইন-০১৩২০১৬০০০০ নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সৈকতের সুগন্ধা-লাবনী ও কলাতলী পয়েন্টে পর্যটক সমাগম একটু বেশি। তবে সব পয়েন্টে পর্যটকরা নামছে। তাই প্রতিটি পয়েন্টে তথ্যকেন্দ্র সচল রয়েছে। কোথাও পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মাঠে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor