ঢাকাঃ উপসাগরীয় মরুভূমির দেশগুলোতে তেলের চেয়েও পানিই বেশি মূল্যবান বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। সেখানে মাটির নিচে জ্বালানি ভান্ডার থাকলেও পানির জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় সমুদ্রের দিকে। সে পানির উৎসই এখন যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
চলমান সংঘাতে ডেসালিনেশন প্লান্টগুলোতে হামলা ও ধ্বংসের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক নতুন বাস্তবতায়। যেখানে তেলের পর জীবন ধারণের মৌলিক উপাদান পানিও হয়ে উঠছে কৌশলগত অস্ত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডেসালিনেশন প্লান্টে হামলা ও ধ্বংসের হুমকি এমন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে লাখো মানুষ অল্প সময়েই নিরাপদ পানির বাইরে চলে যেতে পারে। এতে তৈরি হতে পারে বড় ধরনের মানবিক সংকট।
বিশাল তেলসম্পদ, উঁচু আকাশচুম্বী শহর, বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যস্ত বন্দর সবকিছুর মাঝেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস নেই বললেই চলে। নদী নেই, স্থায়ী হ্রদ নেই, বৃষ্টিপাত অল্প আর ভূগর্ভস্থ পানিও সীমিত। ফলে এসব দেশের জীবনযাত্রা, কৃষি, শিল্প এমনকি নগরায়ণের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে যে প্রযুক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হয়, সেটিই হলো সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন। যাকে বলা হয় ‘ডেসালিনেশন’। এর মাধ্যমে সমুদ্রের পানি সংগ্রহ করে তা বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে লবণ ও অন্যান্য খনিজ থেকে মুক্ত করা হয়। তারপর সেই পানি শহর, শিল্প ও কৃষিতে সরবরাহ করা হয়। এ পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শক্তিনির্ভর। বলা যায় ডেসালিনেশন প্রযুক্তি এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি কার্যত এ অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষার প্রযুক্তি।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে এরই মধ্যে বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবে পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য পারস্পরিকভাবে ইরান ও আঞ্চলিক পক্ষগুলো একে অপরকে দায়ী করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরানের ডেসালিনেশন প্লান্ট ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। গতকাল তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল ক্ষেত্র এবং সম্ভবত সব ডেসালিনেশন প্লান্ট ধ্বংস করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সামরিক কৌশলের পরিবর্তন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি গুরুতর প্রশ্নও। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইউসরা সুয়েদি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এ ধরনের হুমকি যুদ্ধের সময় সমষ্টিগত শাস্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।’ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেসালিনেশন প্লান্টগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতা বুঝতে হবে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ এ অঞ্চলে বসবাস করলেও বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য মিঠা পানির মাত্র ২ শতাংশ এখানে রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলো সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জল তৈরি করার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৮ হাজার ডেসালিনেশন প্লান্ট রয়েছে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মধ্যপ্রাচ্যে। সংখ্যার চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎপাদনের ঘনত্ব। মাত্র ৫৬টি বড় প্লান্ট থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের ৯০ শতাংশের বেশি ডেসালিনেটেড পানি সরবরাহ করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বে উৎপাদিত মোট ডেসালিনেটেড পানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এ অঞ্চল থেকে।
দেশভেদে নির্ভরতার মাত্রা আরো স্পষ্ট। কাতারে প্রায় ৯৯ শতাংশ পানীয় জল আসে ডেসালিনেশন থেকে। কুয়েত ও বাহরাইনে এ হার প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ অনেক দেশের ক্ষেত্রে এ প্লান্টগুলো কার্যত জীবনরেখা। এ নির্ভরতার কারণেই ডেসালিনেশন প্লান্টগুলো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। এগুলো সাধারণত উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত, সহজে শনাক্তযোগ্য এবং প্রায়ই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে একটি হামলায় একই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ—দুটিই বিপর্যস্ত হতে পারে।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ এরিকা ওয়েইন্থাল সতর্ক করে বলেন, ‘আপনাকে ডেসালিনেশন প্লান্ট ধ্বংস করতেই হবে না। আপনি যদি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত করেন, তাহলেই পানি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এ কাঠামোগত দুর্বলতাই এগুলোকে যুদ্ধের সময় সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।’
ইতিহাসও দেখাচ্ছে, পানি অবকাঠামো বহুবার যুদ্ধের লক্ষ্য হয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাক কুয়েতের ডেসালিনেশন সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৬-১৭ সালে পানি স্থাপনায় হামলা চালায়। ২০১৯ সালে হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবের একটি প্লান্টে হামলার দায় স্বীকার করে। গাজাতেও সাম্প্রতিক সংঘাতে ডেসালিনেশন অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের একটি হামলায় কয়েক দিনের মধ্যেই লাখো মানুষ পানীয় জলের বাইরে চলে যেতে পারে। পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু গৃহস্থালি নয় হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা সবকিছুই অচল হয়ে পড়বে। সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। পরিষ্কার পানির অভাবে দ্রুত পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং শহরগুলোতে ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানান্তরের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। ডেসালিনেশন প্লান্টগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জ্বালানিনির্ভর। এগুলো পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যার ৯০ শতাংশের বেশি আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল থেকে। ফলে একটি প্লান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু পানি নয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও চাপ তৈরি হয়।
এ প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যেখানে তেলের পাশাপাশি পানিও কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর সিভিলিয়ানস ইন কনফ্লিক্টের পরিচালক অ্যানি শিল ট্রাম্পের ডেসালিনেশন প্লান্টে হুমকিকে ‘ভয়াবহ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বেসামরিক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের হামলার প্রভাব হবে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক। হাসপাতালগুলো বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়তে পারে, নিরাপদ পানির অভাবে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ জরুরি তথ্য ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হারাবে। সব মিলিয়ে ডেসালিনেশন প্লান্টে হামলা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।’