ঢাকাঃ ভিয়েতনামের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে গোল্ডেন ব্রিজ। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ম্যাগাজিন টাইম আউট প্রকাশ করেছে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সেতু’র একটি বিশেষ তালিকা, যেখানে এই সোনালী সেতু চতুর্থ স্থান অধিকার করে নিয়েছে।
এই র্যাংকিং শুধুমাত্র একটি সেতুর নির্মাণশৈলী বা চাকচিক্য নয়, বরং তার সামগ্রিক নান্দনিক মূল্য, পর্যটন প্রতীক হিসেবে ভূমিকা এবং বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টির ক্ষমতাকে বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল তিনটি প্রধান মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই তালিকা সাজিয়েছেন—অনন্য স্থাপত্য নকশা, ভূদৃশ্যের সঙ্গে নিখুঁত সামঞ্জস্য এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। এই তালিকায় অনেক প্রাচীন ও ঐতিহাসিক সেতুকে পেছনে ফেলে গোল্ডেন ব্রিজের এই অবস্থান ভিয়েতনামের পর্যটন শিল্পের জন্য এক বিরাট গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভিয়েতনামের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এবং এর স্থায়ী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে আধুনিক স্থাপত্য কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
গোল্ডেন ব্রিজের সৌন্দর্যের মূলে রয়েছে তার অসাধারণ নকশা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৪০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় সান ওয়ার্ল্ড বা না হিলস কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত এই সেতুটি প্রায় ১৫০ মিটার লম্বা। তার রেলিং সোনার প্রলেপে ঝলমল করে এবং পাহাড়ের ঢালকে যেন আলিঙ্গন করে রেখেছে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো দুটি বিশাল পাথরের হাত, যা মাঝ আকাশে ঝুলন্ত বাঁকা সেতুটিকে ধরে রেখেছে। এই হাতের চিত্রটি সেতুকে সাধারণ একটি হাঁটার পথ থেকে একটি আইকনিক স্থাপত্য মাস্টারপিসে রূপান্তরিত করেছে।
টাইম আউট ম্যাগাজিনের প্রবন্ধে লেখক দেউই নুরজুইতা এই অভিজ্ঞতাকে ‘অলৌকিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, দর্শনার্থীরা যখন সেতু পেরোন, তখন মনে হয় যেন তারা মেঘের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছেন। মেঘ জমে গেলে সেতুটি যেন আকাশে ভাসমান এক স্বর্গীয় পথ, আর আকাশ পরিষ্কার হলে পুরো বা না পর্বতশ্রেণী দিগন্তজুড়ে উন্মোচিত হয়ে যায়।
আলো, মেঘ আর কুয়াশার অবিরাম খেলা প্রতিটি মুহূর্তকে অনন্য করে তোলে। একই দিনে বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ করলেও প্রতিবারই নতুন দৃশ্য চোখে পড়ে, যা পর্যটকদের বারবার ফিরে আসতে প্রলুব্ধ করে।
এই সেতু শুধু একটি দৃশ্যমান বিস্ময় নয়, এর চারপাশের পরিবেশও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সান ওয়ার্ল্ড বা না হিলস কমপ্লেক্সে গোল্ডেন ব্রিজ পেরিয়ে গেলে অপেক্ষা করে বিশ্বমানের ইনডোর ও আউটডোর শো, মেঘের সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত মন্ত্রমুগ্ধকর দুর্গ, ভিয়েতনামের সর্বোচ্চ ব্রুয়ারি সান গড ওয়াটারফল এবং সারা বছর ধরে ফুটে থাকা প্রাণবন্ত ফুলের বাগান।
চমৎকার দুর্গের স্থাপত্য এবং মৌসুমী ফুলের উৎসব দর্শনার্থীদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। শীতকালে যখন চারদিকে ফুলের সমারোহ, তখন এই জায়গাটি যেন রঙিন এক স্বপ্নপুরী।
গ্রীষ্মে মেঘের আচ্ছাদন আর শীতল বাতাসের মাঝে সেতু হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি একেবারে অতুলনীয়। এই সবকিছু মিলিয়ে গোল্ডেন ব্রিজ শুধু একটি সেতু নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পর্যটন অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই গোল্ডেন ব্রিজ বিশ্বব্যাপী মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এমনকি ‘বিশ্ব পর্যটন শিল্পের অস্কার’ খ্যাত ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যাওয়ার্ডসে টানা চার বছর ধরে এটিকে ‘বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইকনিক পর্যটন সেতু’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়েছে। এই স্বীকৃতিগুলো প্রমাণ করে যে গোল্ডেন ব্রিজ কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বরং ভিয়েতনামের পর্যটন শিল্পের এক অমূল্য সম্পদ।
-B