পাহাড়ের ঢালে সবুজে আচ্ছাদিত বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন

মনিটর রিপোর্ট Date: 30 June, 2024
পাহাড়ের ঢালে সবুজে আচ্ছাদিত বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন

চট্টগ্রাম: ১৯৩৯ সাল। বিশ্বযুদ্ধের দামামায় শান্তিকামী মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে অস্ত্রের গর্জন আর ছোপ ছোপ রক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ রকম সর্বগ্রাসী ছোবল ভারতীয় উপমহাদেশের যেসব জায়গায় লেগেছিল, তার অন্যতম চট্টগ্রাম। 

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোতাশ্রয় চট্টগ্রাম এলাকা ছিল আরাকান সামরিক তৎপরতার অন্যতম ঘাঁটি ও উল্লেযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল। এই হাসপাতালে নিহত যোদ্ধাদের দাফনের জন্য তৈরি করা হয় একটি সমাধিস্থল। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ স্মৃতিময় স্থান চট্টগ্রাম রণসমাধিক্ষেত্র, যা চট্টগ্রাম ‘ওয়ার সিমেট্রি’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এ রকম দুটি ওয়ার সিমেট্রির একটি চট্টগ্রাম মহানগরীর বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়কে; অপরটি কুমিল্লার ময়নামতিতে।

চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঢালে সবুজে ঘেরা এক প্রাঙ্গণ ওয়ার সিমেট্রি। ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবনে কোলাহলের মধ্যেই শ্যামল প্রকৃতিঘেরা এক ভিন্ন জগৎ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলে নিহত হওয়া সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ৭৫১ জন যোদ্ধার সমাধিস্থল এটি। ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে টানে এই সমাধিস্থল। নিরিবিলি পরিবেশে একটা নির্দিষ্ট সময়ে নগরবাসী গোছানো এই সমাধিস্থলে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মদানকারী সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে; সময় কাটায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈন্যদের সম্মানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমে দিকে এই সিমেট্রিতে ছিল ৪০০ সেনার সমাধিস্থল। বর্তমানে ৭৫১টি সমাধি রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ নাবিক, ৫৪৩ সৈনিক ও ১৯৪ জন বৈমানিকের সমাধি নামফলক দিয়ে চিহ্নিত। নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮, কানাডার ২৫, অস্ট্রেলিয়ার ৯, নিউজিল্যান্ডের ২, অবিভক্ত ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০, মিয়ানমারের ২, নেদারল্যান্ডসের ১ ও জাপানের ১৯ জন রয়েছেন। এই যুদ্ধ সমাধিতে ৭৫১ জনের প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্মীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের সাবেক কিউরেটর ড. শামসুল হোসাইন বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মদানকারী দেশি-বিদেশি সৈনিকদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা যুদ্ধ সমাধিতে ৪০ জাতের বৃক্ষরাজি রয়েছে। রয়েছে দেবদারু, গর্জন, মেহগনি, ইউক্যালিপ্টাস, পাম গাছ। এ ছাড়া গন্ধরাজ, বেলি, পাতাবাহার, লেনথেনা, গোলাপ লেটারলিফসহ কয়েকশ দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ সমাধিতে নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করেছে।

প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে সবুজের চাদর বিছানো ওয়ার সিমেট্রি। ওয়ার সিমেট্রির ফটক থেকে সামান্য পথ হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে দুটি ছোট গির্জা ও দরজা। ওই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাওয়া যায় পবিত্রতা ও নিস্তব্ধতার পরশ। হাতের ডান পাশে গির্জার একটি নিবন্ধন বইতে লেখা আছে ভারতীয় বাণিজ্যতরীর প্রায় ছয় হাজার নাবিক ও লস্করের নাম, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাগরে প্রাণ হারান। মৃতদেহ পাওয়া যায়নি বলে তাদের নাম স্মরণ করে সম্মান দেখানো হয়। হাতের বাঁ পাশের গির্জায় রয়েছে সিমেট্রি রেজিস্টার, যাতে লেখা রয়েছে সমাহিত সেনাসদস্যদের নাম।

বিভিন্ন ফুল ও ফল গাছে সুশোভিত বিশাল জায়গা নিয়ে গড়া এই সমাধিস্থলে চোখে পড়বে অতি যত্নে  সংরক্ষিত কবরের সারি। প্রত্যেক স্মৃতিফলকে মৃত সৈন্যের নাম, বয়স, জাতীয়তা ও র‌্যাংক পিতলের প্লেটে খোদাই করে লেখা আছে। সমাধিস্থলের মাঝামাঝি রয়েছে একটি ক্রুশ চিহ্ন এবং শেষ প্রান্তে প্রার্থনাকক্ষ। সেখানে বাংলা ও ইংরেজিতে তৎকালীন ইতিহাস ও মানচিত্র দেওয়া আছে। প্রতিদিনই প্রচুর দর্শনার্থীর পাশাপাশি এই সমাধিভূমিতে পর্যটকদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। এই স্তম্ভের একেবারে পেছনের দিকে রয়েছে সৈন্যদের কবর। এর সামনে রয়েছে সৈন্যদের স্মৃতিফলক।

চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি দেখাশোনায় একজন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে পাঁচজন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা এবং ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই সিমেট্রি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor