হিমছড়ি – যেখানে পাহাড় ছুঁয়েছে সাগর, বয়ে চলেছে ঝরনা

জাফর আলম Date: 08 July, 2025
হিমছড়ি – যেখানে পাহাড় ছুঁয়েছে সাগর, বয়ে চলেছে ঝরনা

কক্সবাজারঃ সাগরের পাশে বিশাল পাহাড়। সেই পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়েছে শীতল পানির ঝরনা। পাহাড়-ঝরনার নাম—হিমছড়ি। তবে পাহাড়টি আগে পরিচিত ছিল ‘হিমপরির পাহাড়’ নামে। 

স্থানীয় মানুষের কাছে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, একসময় উঁচু পাহাড়টির চূড়ায় সময় কাটাতেন সাগর থেকে উঠে আসা পরিরা। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে টেকনাফের দিকে ১২ কিলোমিটার এগোলোই দেখা মেলে এই পাহাড়ের। এলাকাটির নামই এখন হিমছড়ি। এলাকায় অবস্থিত সমুদ্রসৈকতও পরিচিত হিমছড়ি সৈকত নামে।

প্রায় ২৮০ ফুট উঁচু হিমছড়ি পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখা যায় চারপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য। উপভোগ করা যায় সমুদ্রের গর্জন। ঝরনার শীতল জলে শরীর ভিজিয়ে নেওয়ার সুযোগ তো আছেই।

হিমছড়ি প্রবেশের পথেই চোখে পড়ে দুপাশে শতাধিক দোকানপাট। সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, জিপ-মাইক্রোবাসসহ নানা যানবাহনের ভিড়। অনেক পর্যটকের কাছে অস্বস্তিকর ঠেকে এই দৃশ্য। তবে হিমছড়িতে পাহাড়-সাগর আর ঝরনার দৃশ্য দেখার আনন্দ যেন এসব ভুলিয়ে দেয়।

দেখা যায় ঝরনার আশপাশে কয়েকটি বিশ্রামাগার। ঝরনায় যাতায়াতের রাস্তাতে বসানো হয়েছে রকমারি পণ্য বেচাবিক্রির ২০ থেকে ২৫টি দোকান। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ পর্যটকেরা বিশ্রামাগারে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ দোকানে গিয়ে সেরে নিচ্ছেন কেনাকাটা। 

শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি রকমারি পণ্য, ফলমূল, আচার, ডাব, চিনাবাদামসহ নানা খাবারদাবার রয়েছে এসব দোকানে। 

কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে পর্যটকেরা ভেতরে ঢুকছেন। টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৩৫ টাকা। এক টিকিটেই ঝরনা দেখা ও পাহাড়চূড়ায় ওঠার সুযোগ। ভেতরে ঢুকেই দেখা গেল, পর্যটকদের বেশির ভাগ ছুটছেন ঝরনার দিকে। কেউ ঝরনার হিমশীতল পানিতে গা ভাসাচ্ছেন। কেউ ছবি তোলায় ব্যস্ত। কয়েকজন তরুণকে হিমছড়ি ঝরনায় পানি কম থাকা নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখা যায়।

যশোর থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, বেশ আগে তিনি প্রথমবার যে হিমছড়ি ঝরনা দেখে গেছেন, এখন যেন তার অনেক কিছুই নেই। পাহাড়ের ওপর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে খুবই কম। তাঁর দাবি, অযত্নে-অবহেলায় এই পাহাড়-ঝরনা সৌন্দর্য হারাচ্ছে।

হিমছড়ি ঝরনা ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র পরিচালনা করে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ। কেন্দ্রের ইজারাদার জাফর আলম বলেন, ‘দৈনিক টিকিট কেটে এক হাজারের বেশি পর্যটক ঝরনা দেখতে আসেন। তবে পর্যটন মৌসুমে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সবকিছু আমরাই দেখাশোনা করি। কেন্দ্রের বাইরের দোকানপাটের ইজারা, শান্তি-শৃঙ্খলা তদারক করে রামু উপজেলা পরিষদ।’

 পাহাড় ছুঁয়েছে সাগর, বয়ে চলেছে ঝরনা

                                                পাহাড়চূড়া থেকে যা দেখা যায়

ঝরনা থেকে উত্তর দিকে কিছুটা অগ্রসর হলে পাহাড়ে ওঠার পাকা সিঁড়ি। দুই পাশে এসএস পাইপের রেলিং লাগানো। সিঁড়ির বিভিন্ন প্রান্তে টানানো আছে সতর্কবাণীর একাধিক সাইনবোর্ড। দুপুর ১২টায় কাঠফাটা রোদের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে দেখা যায় নানা বয়সী পর্যটকদের। কয়েক ধাপ অতিক্রমের পর কেউ দাঁড়িয়ে দম ফেলছেন।

সিঁড়ির কয়েক ধাপ ওঠার পর সমতল একটি জায়গায় ‘ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি শো’ দেখানো হচ্ছে। শো দেখার জন্য নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা করে। সিঁড়ি বেয়ে আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলে কয়েকটি কাঠের চৌকি। সেখানে বসে অনেকে জিরিয়ে নিচ্ছেন। পাশে একটি দোকানে ডাব, চা-কফি বিক্রি হচ্ছে। এর পাশেই সেলফি জোন। সাগর পেছনে রেখে সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন পর্যটকেরা।

দৈনিক টিকিট কেটে এক হাজারের বেশি পর্যটক ঝরনা দেখতে আসেন। তবে পর্যটন মৌসুমে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সবকিছুই আমরাই দেখাশোনা করি। কেন্দ্রের বাইরের দোকানপাটের ইজারা, শান্তি-শৃঙ্খলা তদারক করে রামু উপজেলা পরিষদ,
ইজারাদার জাফর আলম, হিমছড়ি ঝরনা ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র।

পাহাড়চূড়ার সর্বশেষ প্রান্তে একটি দালানঘর। সামনে খোলা মাঠ। মাঠে দাঁড়িয়ে পর্যটকেরা নিচের মেরিন ড্রাইভ, ঝাউবাগান, সমুদ্রসৈকত ও সাগর দেখছেন। সেখানেও একটি সেলফি জোন রয়েছে। পেছনে লেখা, ‘আমরা এখন হিমছড়িতে’।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময় হিমছড়ি পাহাড়ের বেশ কিছু বড় গর্জনগাছ উপড়ে পড়ে। এতে পাহাড় থেকে পানি নিচে নামার কিছু পথ ভরাট হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ঝরনার পানিতে। পানি কমে যাওয়ায় অনেক পর্যটক হিমছড়ি এসে হতাশ হন। তবে বর্ষায় পানি বাড়ে বলে জানান তিনি।

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor