ঢাকাঃ বিশ্বায়নের দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্পবাজারে নিলামঘরগুলো হয়ে উঠছে চিত্রকর্মের নতুন ভাণ্ডার।
এ বাস্তবতায় এক ভিন্ন পথে হাঁটার উদ্যোগ নিয়েছে ইতালি। নিজস্ব শিল্প ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে দেশটি। এ প্রয়াসে রাষ্ট্র নিজেই হয়ে উঠছে সংগ্রাহক, আর শিল্পকর্মগুলো ফিরে আসছে তাদের জন্মভূমির আলোর ভেতর।
ইতালির রাজধানী রোমের সিনেট ভবনে সম্প্রতি উন্মোচন হয়েছে প্রারম্ভিক রেনেসাঁ যুগের শিল্পী আন্তোনেলো দা মেসিনার ভক্তিমূলক চিত্রকর্ম ‘এক্সে হোমো’ (‘এই সেই মানুষ’—যিশুকে জনতার সামনে উপস্থাপনের মুহূর্ত বোঝাতে ব্যবহৃত)।
চিত্রকর্মটি ১৪৭০ সালে আঁকা। বিখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান সদবি’জের নিউইয়র্কের অকশন হাউজ থেকে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারে সংগ্রহ করেছে ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। চিত্রকর্মটি আকারে ছোট—মাত্র ২০.৩×১৪.৯ সেন্টিমিটার। তবে এর শিল্পমান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
কাঠের প্যানেলে আঁকা দ্বিমুখী চিত্রকর্মটির এক পাশে দেখা যায় কাঁটার মুকুট পরা ও গলায় দড়ি বাঁধা যিশুকে। এ সময়েই পন্টিয়াস পাইলেট ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য যিশুকে জনতার হাতে তুলে দেন। ছবির অন্য পাশে পাপ স্বীকাররত সেন্ট জেরোমকে দেখা যায়।
জানা যায়, পূর্ববর্তী মালিক বহু বছর ধরে এটি নিজের সঙ্গে বহন করতেন এবং প্রার্থনার সময় ব্যবহার করতেন। ফলে শিল্পটি হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতারও এক নিদর্শন।
ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এ ক্রয় একক কোনো ঘটনা নয়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ইতালি সরকার বিখ্যাত শিল্পী কারাভাজ্জিওর একটি বিরল প্রতিকৃতি প্রায় ৩ কোটি ইউরো দিয়ে সংগ্রহ করেছে। ধারাবাহিক এ পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয়—ইতালি এখন পরিকল্পিতভাবে তার শিল্প ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে মনোযোগী।
এ প্রসঙ্গে ইতালির সংস্কৃতিমন্ত্রী আলেসান্দ্রো গিউলি বলেন, ‘এটা সত্য যে এ ধরনের শিল্পকর্মের সংগ্রহ বাড়ানোর একটি নীতি আমরা গ্রহণ করেছি। আমরা চাই মানুষ বুঝতে পারুক, অসাধারণ শিল্পমান ও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এসব কাজ ইতালিতে ফিরিয়ে আনা এবং সেগুলোকে ইতালীয়দের পাশাপাশি বিশ্ববাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বাজেট খুব বড় নয়—সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট জাতীয় বাজেটের দশমিক ৩ শতাংশেরও কম। তবে এটি শিল্পকর্ম কেনার জন্য যথেষ্ট। আর এসব কেনাকাটা সরকারের অন্যান্য খাতের অর্থায়নে কোনো প্রভাব ফেলে না।’
নিলামে ওঠার আগেই ইতালি সরকার এ চিত্রকর্ম সম্পর্কে অবগত হয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। প্রথমে ল’আকুইলার ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আব্রুজ্জোতে প্রদর্শনের পর এটি ইতালির বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হবে, যাতে দেশের সাধারণ মানুষও সরাসরি এ ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ পান।
সময়ের স্রোতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া শিল্পকে পুনরায় আপন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনার এ প্রচেষ্টা কেবল সংগ্রহ নয়; এ এক পুনর্জাগরণ। ইতালির এ উদ্যোগ যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, শিল্প কখনো কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত এক অনন্ত আলোকরেখা।
-B