মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: চাপের মুখে দেশের বিমান ও পর্যটন খাত

- A Monitor Special Date: 16 March, 2026
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: চাপের মুখে দেশের বিমান ও পর্যটন খাত

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বিমান চলাচল ভ্রমণসংশ্লিষ্ট খাতে। উপসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ করিডর হওয়ায় হঠাৎ করে ফ্লাইট স্থগিত বাতিল হওয়ায় বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর, হোটেল এবং সংশ্লিষ্ট নানা সেবা খাতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, গত ১৩ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের মধ্যে মোট ৪৪৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং এই  পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ১৫ মার্চের মধ্যে ৫০০-তে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংঘাত চলমান থাকায় এবং আকাশসীমা ব্যবহারে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থা তাদের ফ্লাইট সূচি পুনর্বিন্যাস করছে।ফলে ঢাকা থেকেও  পরিচালিত বহু ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, ফ্লাইট বাতিলের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বিমান খাতের আয়ে। বিশেষ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকেই এই দুই প্রতিষ্ঠানের আয়ের বড় একটি অংশ আসে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে যাত্রী ভোগান্তির পাশাপাশি বিমান খাতেও বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বিমানবন্দর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় লোকসান

ঢাকা থেকে বহির্গামী আগত প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকেই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক উৎস থেকে আয় করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অবতরণ পার্কিং ফি, এরোনটিক্যাল নেভিগেশন চার্জ, যাত্রীসেবা ফি, নিরাপত্তা ফি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা।

বাংলাদেশে বিদেশি সব এয়ারলাইনের জন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা প্রদান করে থাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল কমে গেলে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটিও সরাসরি এই প্রভাবের মুখে পড়ে।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ঢাকার বিমানবন্দরে একটি স্বাভাবিক টার্নঅ্যারাউন্ডে একটি ন্যারোবডি উড়োজাহাজের জন্য এয়ারলাইনগুলোকে গড়ে প্রায় হাজার মার্কিন ডলার এবং একটি ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের জন্য প্রায় ১২ হাজার ডলার বিভিন্ন চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাতিল হওয়া প্রায় ৫০০টি ফ্লাইটের মধ্যে আনুমানিক ১৮৫টি ন্যারোবডি এবং ২১৫টি ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ ছিল, বাকি অংশ ছিল মিশ্র অপারেশন।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কেবল এরোনটিক্যাল গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ থেকেই অল্প কয়েক দিনেই প্রায় - মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এতে করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)–এর পরিচালন আয়ের পাশাপাশি বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং আয়েও বড় ধরনের ধাক্কা লাগছে।

রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা মুখপাত্র বোশরা ইসলাম বলেছেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে তারা শুধু গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ফি- হারাচ্ছেন না, পাশাপাশি বিমান টিকিট বিক্রি থেকে যে আয় হতো সেটিও হারাচ্ছে সংস্থাটি।

বাতিল ফ্লাইটে রাজস্ব হারাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট কমে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ জন ফিরতি যাত্রী হারাচ্ছে এয়ারলাইন্সটি।

তিনি বলেন, আগে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটে একাধিক ফ্লাইট পরিচালনা করত ইউএস-বাংলা। তবে বর্তমানে শারজাহ ও আবুধাবি রুটের ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে, পাশাপাশি কাতারগামী ফ্লাইটও বন্ধ রাখা হয়েছে। এয়ারলাইনটির ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে শারজাহ রুটে এবং ১৪ এপ্রিল থেকে আবুধাবি রুটে ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

কামরুল ইসলাম আরও জানান, একমুখী টিকিটের গড় মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা ধরলে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে এয়ারলাইনটি।

এদিকে ট্রানজিট যাত্রী কমে যাওয়ায় দেশের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনসও এর প্রভাব অনুভব করছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নভোএয়ার-এর পরিচালক (মার্কেটিং ও সেলস) সোহেল মজিদ জানিয়েছেন, সিলেট রুটে টিকিট বাতিলের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, “প্রতিটি সিলেট ফ্লাইটে এখন ২০-২৫টি টিকিট ফেরত হচ্ছে, যা আমাদের যাত্রী ধারণক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশ। এর আগে এই যাত্রীদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনের মাধ্যমে ইউরোপ ও অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াত করত। কিন্তু গালফ অঞ্চলের ট্রানজিট ফ্লাইট কমে যাওয়ায় দেশীয় ট্রানজিট ভ্রমণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে মজিদ জানান, নভোএয়ার তুলনামূলকভাবে ছোট নেটওয়ার্কে কাজ করার কারণে প্রভাব নিয়ন্ত্রণযোগ্য রয়েছে। বর্তমানে তারা কক্সবাজার, সিলেট, সৈদপুর ও চট্টগ্রাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

হোটেল খাতেও কমেছে আয়

চলমান সংঘাতের প্রভাব রাজধানীর আতিথেয়তা খাতেও পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার হোটেলগুলো, যেখানে সাধারণত বিমান ক্রুরা অবস্থান করেন, তাদের ব্যবসায়ও উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান এয়ারলাইনগুলো সাধারণত ঢাকা আসার পর ওয়াইডবডি উড়োজাহাজে থাকা ক্রুদের জন্য শহরের শীর্ষ হোটেলগুলোতে রাত্রীকালীন থাকার ব্যবস্থা করে, যাতে তারা ফিরতি ফ্লাইটের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন। এক একটি ওয়াইডবডি ফ্লাইটে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ জন ক্রু সদস্য থাকেন, যার মধ্যে পাইলট কেবিন ক্রু অন্তর্ভুক্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২১৫টির মত ওয়াইডবডি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় হোটেল খাতে আনুমানিক ,০০০ ক্রু রুম ভাড়া ক্ষতি হয়েছে। একজন ক্রুর গড় খরচ, যার মধ্যে থাকার, খাবার অন্যান্য সেবা অন্তর্ভুক্ত, প্রায় ২৫০ মার্কিন ডলার হলে, হোটেল খাতের মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭৫০,০০০ মার্কিন ডলার।

ঢাকার শীর্ষ কয়েকটি হোটেলপ্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, লা মেরিডিয়েন ঢাকা এবং রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনসাধারণত বিমান ক্রুদের থাকার ব্যবস্থা করে থাকে এবং এই হোটেলগুলোই সবচেয়ে বেশি প্রভাব অনুভব করছে।

হোটেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক ক্ষতি কেবল বিমান ক্রুদের কমে যাওয়ার কারণে সীমাবদ্ধ নয়। চলমান সংঘাতের প্রভাবের কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্ট বাতিল হওয়া এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের সংখ্যা কমেও এই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার স্টার হোটেলগুলোতে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর অতিথির সংখ্যা ২৫৩০ শতাংশ কমেছে। পাঁচ তারকা হোটেলের একজন জেনারেল ম্যানেজার জানান, গত ১০ দিনে তাদের প্রায় ৭০ লাখ টাকার বুকিং বাতিল হয়েছে, যা হোটেলের মাসিক অনুমানকৃত আয়ের প্রায় ১০ শতাংশের সমতুল্য।

বিদেশগামী যাত্রী কমে সরকারের রাজস্ব সংকুচিত

শত শত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিলের ফলে বিদেশগামী যাত্রীদের উপর সরকারের আয় প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক যাত্রী বাংলাদেশের বাইরে যাত্রা করার সময় বিভিন্ন ধরনের কর ফি প্রদান করেন, যেমন ভ্রমণ কর, এ্যাম্বার্কেশন ফি, নিরাপত্তা চার্জ এবং এক্সাইজ ডিউটি। গড় হিসাবে, এসব চার্জ মোটামুটিভাবে ৪৫ থেকে ৫৫ মার্কিন ডলার যাত্রী প্রতি।

প্রতিটি ফ্লাইটে গড় ২৫০ যাত্রী ভ্রমণ করে থাকে সেই  হিসেবে ৫০০ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে প্রায় ,২৫,০০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেনি। এই হিসাব অনুযায়ী, সরকারের মোট মিলিয়ন ডলার রাজস্ব হ্রাস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যাত্রীসংক্রান্ত কর ফি থেকে।

পরিস্থিতি সরকারের রাজস্বের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক  প্রভাব ফেলবে।

এয়ারপোর্ট রিটেইল পরিবহন সেবায়ও কমেছে আয়

যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ায় বিমানবন্দর এবং এর আশপাশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ডিউটি-ফ্রি শপ, বিমানবন্দর রেস্তোরাঁ, খুচরা দোকান এবং সার্ভিস কাউন্টারগুলো আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলি বন্ধ থাকায় এবং ভ্রমণ বাতিল হয়ে  যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সূত্রমতে, প্রতিজন যাত্রী গড়ে বিমানবন্দরে খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটা অন্যান্য সেবায় ২০৩০ মার্কিন ডলার ব্যয় করে। গড়ে ২৫ ডলার ধরলে, এয়ারপোর্টের রিটেইল খাতে ক্ষতি হতে পারে . মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

এছাড়াও বিমানবন্দরের ট্যাক্সি, লিমোজিন, রাইড-শেয়ার সার্ভিস এবং লজিস্টিক কোম্পানিগুলোর আয়ও হ্রাস পেয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব: রাজস্ব ক্ষতি ১৫-১৬ মিলিয়ন ডলার

বিভিন্ন প্রভাব একত্রে বিবেচনা করলে, বাংলাদেশে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া থেকে মোট আর্থিক ক্ষতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কেবল কয়েক

Share this post



Also on Bangladesh Monitor