ইউরোপে গণপর্যটনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড়

-মনিটর অনলাইন Date: 21 August, 2025
ইউরোপে গণপর্যটনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড়

ঢাকাঃ ইউরোপের জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোতে জনঅসন্তোষ এখন আর নিছক ক্ষোভ নয়—এটি এক গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। তাদের দাবি—সাধারণ, অগোছালো বা কম খরচে আসা ভ্রমণকারী পর্যটকদের উপস্থিতি স্থানীয়দের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গ্রীষ্মকালে ইউরোপজুড়ে পর্যটনের ঢেউ যখন তুঙ্গে, ঠিক একইসময়ে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে উঠেছে এক অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের জোয়ার। 

বার্সেলোনার জলপিস্তল মিছিল থেকে শুরু করে ভেনিসে বিলিয়নিয়ার বিয়েতে বিঘ্ন ঘটানো, এমনকি লুভর জাদুঘরে অতিরিক্ত ভিড়ের প্রতিবাদে কর্মচারীদের অসহযোগের ফলে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া—সবই স্থানীয়দের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছেন, ‘অতিথির’ চাপে তারা হারাতে বসেছেন তাদের শহরগুলোকে।

বার্সেলোনার অধ্যাপক মাইতে ডোমিঙ্গো আলেগ্রে বলেন, ‘আমি আগে লাস রামব্লাসের কাছাকাছি হাঁটতে গিয়ে পাখির ডাক আর গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শুনতাম। এখন আর কিছুই শুনি না। পর্যটনের আওয়াজ এত বেশি যে, তা অবিশ্বাস্য।’ তার মতে এ ঐতিহাসিক শহরকেন্দ্রটি এখন পর্যটন-নির্ভর বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের জন্য আর জায়গা নেই।

এইসব ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইউরোপের জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোতে জনঅসন্তোষ এখন আর নিছক ক্ষোভ নয়—এটি এক গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। তাদের দাবি—সাধারণ, অগোছালো বা কম খরচে আসা ভ্রমণকারী পর্যটকদের উপস্থিতি স্থানীয়দের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দীর্ঘদিনের ট্যুর অপারেটর এবং এবিটিএ ও এআইটিএ-র সাবেক চেয়ারম্যান নোয়েল জোসেফাইডস এক দশক আগেই এই সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ‘আমি তখনই বলেছিলাম, সামনে বিশাল সমস্যা আসছে,’ তিনি বলেন। ‘বাজেট এয়ারলাইন্স ও স্বল্পমেয়াদী রেন্টালের উত্থান’-কেই তিনি এই পর্যটন বিস্ফোরণের মূল কারণ বলে মনে করেন।

মহাকাশচারীর পোশাকে পরে ভিড়ের মাঝে হাঁটছেন—নিজের এমন ভিডিও পোস্ট করে ভেনিসের সংগীতশিল্পী অর্নেল্লো করছেন প্রতীকী প্রতিবাদ। তিনি বলেন, ‘চারপাশে শত শত পর্যটকের ভিড়ে নিজ শহরেই নিজেকে বিদেশী মনে হয়।' এছাড়াও তার মতে, শহরের জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় ভেনিস এখন ‘ভেনিসবাসীহীন’ শহরে পরিণত হওয়ার পথে।

প্রতিবাদ ও নীতিগত রদবদলের ধারায় ইউরোপের সরকারগুলোও নড়েচড়ে বসেছে। স্পেনের পালমা শহরে ক্রুজ জাহাজের সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে, এছাড়াও আবাসিক ভবনে রেন্টাল নিষিদ্ধ করা সহ পুরনো হোটেল সারাতে ৫০ মিলিয়নের ইউরোর তহবিল গঠন করেছে তারা। 'আমরা এমন পর্যটক চাই যারা আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল,' বলেন পালমার পর্যটন পরিচালক পেদ্রো হোমার। 'যদি আপনি সম্মান ছাড়াই আসতে চান, তাহলে বলছি—আমরা আপনাকে চাই না।'

এখন প্রশ্ন উঠছে—ভ্রমণের অধিকার কার? ভুটান ও রুয়ান্ডার মতো দেশগুলো উচ্চ ফি দিয়ে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করছে। সেখানে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে ভেনিসের দশ ইউরো মূল্যের প্রবেশ ফি। তবে অধিকাংশ পক্ষই একমত যে—বাসিন্দাদের কেন্দ্রে রেখে পর্যটন নীতি তৈরি করাই ভবিষ্যতের পথ। ‘যে শহরের বাসিন্দারা সন্তুষ্ট নয়, সেই শহর কাজ করে না, বরং তাতে শহরের পরিচয়ই হারিয়ে যায়।’ এমনটাই মত ভিজিট ইটালি-এর প্রধান রুবেন সান্তোপিয়েত্রোর।

অতএব, ইউরোপের বার্তা স্পষ্ট যে, পর্যটনকে টিকে থাকতে হলে পরিবর্তন আনতেই হবে। না হলে হারিয়ে যাবে সেই সৌন্দর্য, যা দেখতে মানুষ ছুটে আসে। টেকসই ও সম্মানজনক পর্যটনই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor