ঢাকাঃ বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে আন্তর্জাতিক কনটেইনার শিপিং খাতে ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা জোরদার হয়েছে। এতে নতুন করে ব্যয়চাপে পড়েছে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাত।
বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলো জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করছে। শীর্ষ কনটেইনার পরিবহন প্রতিষ্ঠান ওশান নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস (ওএনই) ইতোমধ্যে তাদের প্রধান বাণিজ্য রুটে ‘ইমারজেন্সি ফুয়েল সারচার্জ’ কার্যকর করেছে।
কোম্পানির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন এই চার্জ শুকনা ও রেফ্রিজারেটেড—উভয় ধরনের কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও ল্যাটিন আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং ওশেনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটগুলো এর আওতায় এসেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০ ফুট শুকনা কনটেইনারে ১৬০ ডলার এবং ৪০ ফুটে ৩২০ ডলার অতিরিক্ত সারচার্জ ধার্য করা হয়েছে। রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারের ক্ষেত্রে ২০ ফুটে ২১০ ডলার ও ৪০ ফুটে ৪২০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডেলিভারির সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। অনেক জাহাজ বিকল্প রুট হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে চলাচল করছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দুই সপ্তাহ বেশি সময় নিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের বাণিজ্য খাত বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভাড়া বৃদ্ধি, দেশীয় পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ ট্রানজিট সময় মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, চীন-বাংলাদেশ রুটে ইতোমধ্যে প্রতি কনটেইনারে প্রায় ৫০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ফ্রেইট অন বোর্ড (এফওবি) ভিত্তিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্রেতারা ভাড়া বহন করলেও সিঅ্যান্ডএফ চুক্তিতে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে পড়বে।
এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সতর্ক করে জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাণিজ্যের কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তিত হতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শিপিং খাতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও প্রকট হতে পারে।
-B