পর্যটনকেন্দ্র : সেবা কম, খরচ বেশি

- বিশেষ প্রতিনিধি Date: 28 December, 2025
পর্যটনকেন্দ্র : সেবা কম, খরচ বেশি

ঢাকা : উৎসব-পার্বনে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়লেই হোটেল-মোটেলে শুরু হয় 'গলাকাটা বাণিজ্য'। কে কত বেশি টাকা হাতিয়ে নিতে পারে সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। পর্যটন স্পটভিত্তিক ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে সবকিছুর দাম বাড়িয়ে তোলে। এতে পর্যটকদের খরচ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় সেবা বা বিনোদনের সুযোগ পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন শিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

পর্যটকের ঢল নামলেই কক্সবাজারে হোটেলে খরচ বাড়ে, তারকা হোটেলে নেই সেবা| আবাসিক হোটেলগুলোতে রুম ভাড়ার তালিকা টানানোর নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ হোটেল তা মানছে না। তারকামানের হোটেলের পাশাপাশি নিম্নমানের হোটেলগুলোও রুমের ভাড়া বাড়াচ্ছে যেনতেনভাবে। যেকোনো উৎসবে হোটেল মোটেল জোনের অধিকাংশ হোটেল পাঁচশো থেকে এক হাজাট টাকা মূল্যের রুমে ভাড়া বৃদ্ধি করে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে। শুধু তা নয়, রুম নিতে হলে দুই রাতের জন্য নিতে হবে- এমন শর্ত দেয় তারা।

কক্সবাজারে যাওয়া ফাহিম চৌধুরী বলেন, আমরা ঢাকা থেকে কয়েকজন বন্ধু কক্সবাজার এসেছি। এখানে এসে হোটেলে রুম ভাড়া নিতে গেলে তারা প্রতি রুম এক রাতের জন্য পড়েছে অনেক টাকা। যদিও হোটেলের গুণগতমান অত্যন্ত নিম্নমানের।

টানা ছুটিতে এবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ঘুরে গেছেন পাঁচ লক্ষাধিক পর্যটক। পর্যটকের ঢল নামার সুযোগে হোটেল-মোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও রেস্তোরাঁয় বেশি দামে খাবার বিক্রি হয়েছে। 

জানা যায়,  কক্সবাজারে পর্যটকের রাত যাপনের জন্য হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও কটেজ আছে চার শতাধিক। দৈনিক ধারণ ক্ষমতা ১ লাখ ২৮ হাজার জন।

ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে আসা আতিকুর রহমান বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যে কক্ষের ভাড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, এখন তা ৫ হাজার টাকা।

এ দিকে কক্সবাজারের তারাকা হোটেল নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। একটি হোটেলকে ‘তারকা’ মর্যাদা পেতে হলে থাকতে হয় সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত গ্রাহকসেবার মান। তারকা মান শুধু হোটেলের মর্যাদাই বৃদ্ধি করে না, এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও জড়িত। অথচ কক্সবাজারে যেসব পাঁচতারাখচিত হোটেল রয়েছে, তার বেশির ভাগেরই সেবা কম। পর্যটকরা মোটা অঙ্কের ভাড়া গুনেও যথার্থ সেবা পাচ্ছে না।

দেশের প্রচলিত আইনে তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্টগুলোকে নিবন্ধন দেয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। আর তারকা মানের নয় এমন হোটেলগুলো নিবন্ধনের ক্ষমতা দেয়া আছে জেলা প্রশাসনকে। দেশে বর্তমানে তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে ৪১টি। এর বাইরে তারকা মানের নয় এমন হোটেলের সংখ্যা হাজারখানেক।

আইন অনুযায়ী, এসব হোটেল রিসোর্টে পর্যটকদের সেবার মান নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্বও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের। কিন্তু লোকবলের অভাবে এসব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে হোটেল রিসোর্টগুলোর স্বেচ্ছাচারি আচরণের কারণে ঠকতে হচ্ছে পর্যটকদের।

পর্যটকদের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হোটেলের ভাড়া অনেক বেশি। সেবার মানও মানসম্পন্ন নয়। কিন্তু এসব বিষয়ে কেউ যদি অভিযোগ করতে চান, সে সুযোগ খুব একটা নেই।

দেশে একটি তারকা মানের হোটেলের ন্যূনতম ভাড়া শুরু হয় প্রতিরাতের জন্য ৫ হাজার টাকা থেকে। কক্ষের রকম বা সুযোগ-সুবিধা ভেদে ৫০ হাজার টাকা প্রতি রাত ভাড়া এমন কক্ষও রয়েছে হোটেলগুলোতে।

বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বিদেশি পর্যটক খুব একটা দেখা না গেলেও অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। ট্যুর অপারেটরসহ নানা সংস্থার হিসেবে স্বাভাবিক সময় বছরে ৭০-৮০ লাখ পর্যটক দেশের মধ্যেই ভ্রমণ করে বা বেড়াতে যায় তাদের পছন্দের জায়গাগুলোতে, যার শীর্ষে আছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।

বেসরকারি চাকরীজীবী তামান্না বলছেন আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো পর্যটকবান্ধব পরিবেশ কম কিন্তু এখানে খরচ অনেক বেশি। 

তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় এখানে খরচ অনেক বেশি। একই খরচ দিয়ে বাইরের অনেক দেশের তুলনায় আরও ভালোভাবে থাকা যায়। এমনি হয়তো এখন এখানে ভালো রিসোর্ট হোটেল আছে কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় এগুলোতে খরচ বেশি। তামান্না বাইরের দেশ বলতে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও থাইল্যান্ডের প্রসঙ্গ টেনেছেন। বাস্তবতা হলো এসব দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ বিদেশি পর্যটক বেড়াতে যায় বাংলাদেশ তার ধারে কাছেও নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক সামসাদ নওরীন বলেন, আমাদের এখানে একটা মৌসুমে অনেক বেশি টুরিস্ট আসে। আর অন্য মৌসুমে থাকেই না। সে কারণে পিক সিজনে ব্যবসায়ীরা বেশি লাভ করে। এখানে যদি সারা বছর বিভিন্ন ট্যুরিজম থাকতো তাহলে এমন হতো না। 

পশ্চিমা বিশ্বে শীতের সময় টুরিস্টরা অন্য দিকে যায়। আমাদের এদিকে শীতে বেড়াতে যায় বেশি। একইভাবে গ্রীষ্ম বা বর্ষা মৌসুমেও পর্যটক টানার ব্যবস্থা করা যেতো তাহলে অসামঞ্জস্যতা টা দেখা যেতো না। আর এই অসামঞ্জস্যতাই দেশের ট্যুরিজমকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে বলে মনে করেন তিনি। 

-B

Share this post



Also on Bangladesh Monitor