পাম অয়েল সম্পর্কে অজানা তথ্য

- মনিটর অনলাইন রিপোর্ট Date: 03 November, 2021
পাম অয়েল সম্পর্কে অজানা তথ্য

পাম অয়েল বিশ্বের সর্বোচ্চ উৎপাদিত এবং ব্যবহৃত ভেজিটেবল অয়েল। অন্য যে কোন ভেজিটেবল অয়েলের তুলনায় পাম অয়েলের ব্যবহার বহুমাত্রিক। রান্নাবান্না ছাড়াও খাদ্য এবং অন্যান্য শিল্পে এটি বহুল ব্যবহৃত। যে কোন রান্নার তেলের ব্যবহার কয়েকটি বিষয়ের ওপর নীর্ভরশীল যেমন এর সহজপ্রাপ্যতা, মূল্য এবং তেলটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারনা। 

পাম অয়েল বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের অনেক পরে আসলেও বর্তমানে এর মার্কেট শেয়ার ৫৫% এরও অধিক। তেলটি এখন আমাদের দেশে সহজলভ্য, দামের দিক থেকেও তুলনামূলক সস্তা। বাংলাদেশে তেলটি মূলত রান্নাবান্নার কাজে এবং খাদ্য শিল্পে সর্বাধিক ব্যবহৃত। 

তরকারী এবং মসলাযুক্ত খাবার তৈরীতে এটি অত্যন্ত উপযোগী। ফ্রাই করার কাজে পাম অয়েল আদর্শ। খাদ্য শিল্পে এটি পিনাট এবং অন্যান্য নাট বাটারের স্টেবিলাইজার, বিভিন্ন খাবারের বিশেষ করে সিরেল, ব্রেড, কুকিজ, মাফিন, চকলেট এবং মার্জারীনের মান ও স্বাদ বৃদ্ধিতে এটি ব্যবহৃত হয়। 

সাধারণ তাপমাত্রায় এটি সেমি-সলিড হয়ে থাকে যা অনেকের জন্যই শংকার কারন। অনেকে মনে করেন যে পাম অয়েল হার্ট এবং ব্রেনের জন্য ক্ষতিকর। পরবর্তীতে আমরা এই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করবো। তবে, এই মুহুর্তে এটা বলা যেতে পারে যে সেমি-সলিড হবার কারনে পাম অয়েল স্প্রেড হিসেবে ব্যবহার করা যায়, অক্সিডেশন বা জারণ প্রতিরোধী হবার কারনে এটি খাবারের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতে সক্ষম, এবং উচ্চতাপমাত্রা (স্মোকিং পয়েন্ট ২৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস) সহনশীল হওয়ায় এটি বিভিন্ন ফুড আইটেম ফ্রায়িং-এর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। 

ইউএসডিএ’র তথ্য অনুযায়ী পাম অয়েলের পুষ্টি প্রোফাইল অন্যান্য রান্নার তেলের মতোই। এক টেবিল চামচ পাম অয়েল থেকে ১১৪ক্যালরী পাওয়া যায়। এ ছাড়াও এতে থাকে ১৪গ্রাম ফ্যাট, যার মধ্যে ৭গ্রাম স্যাচুরেটেড (বাটারের সমপরিমান), ৫গ্রাম হার্টের জন্য উপকারী মনো আন-স্যাচুরেটেড এবং ১.৫গ্রাম পলি আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাট। উল্লেখ্য, পাম অয়েলে ট্রান্স-ফ্যাটের পরিমান অত্যন্ত কম, ১% এরও নীচে। 

প্রশ্ন হলো, ট্রান্স-ফ্যাট কি? ট্রান্স-ফ্যাট বিভিন্ন খাবারে যেমন পাওয়া যায় কৃত্রিমভাবেও এটি তৈরি হয় যেমন, খাদ্য শিল্পে তরল ভেজিটেবল অয়েলের সঙ্গে হাইড্রোজেন যুক্ত করে অধিক ঘন তেল তৈরীর সময়। গবেষণায় দেখা গেছে ট্রান্স-ফ্যাট মানুষের শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধি এবং ভালো কোলেস্টেরলের পরিমান হ্রাস করে। ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত খাবার হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। হার্ভার্ডের পুষ্টিবিদদের মতে ট্রান্স-ফ্যাট বিবেচনায় পাম অয়েল বাটারের চাইতেও ভালো। 

পাম অয়েলে এন্টিঅক্সিডেন্ট প্রচুর পরিমানে বিদ্যমান, যা মানুষের শরীরের কোষকে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। ফ্রি রেডিক্যাল হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের মূল কারন হিসেবে বিবেচিত। পাম অয়েলে রয়েছে প্রচুর পরিমানে টকোট্রায়েনল, যা ভিটামিন ই এর একটি রূপ এবং এর এন্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা অনেক বেশি। অন্য যে কোন এন্টিঅক্সিডেন্টের তুলনায় এটি কার্যকরভাবে ব্রেইন টিস্যুকে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এর ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি হ্রাসে ধীরগতি পরিলক্ষিত হয় এবং ব্রেইন স্ট্রোকসহ অন্যান্য ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। 

গবেষণায় দেখা গেছে প্রকৃতিতে উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত ক্যারোটিনয়েড বা প্রো-ভিটামিনের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে পাম অয়েল। ভিটামিন এ মানুষের চোখ এবং রেটিনার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মানবদেহে ভিটামিন এ-এর অভাব থেকে রক্ষা করতে পাম অয়েল বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্কুল শিশুদের মধ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভিটামিন এ এর অভাব পূরনে পাম অয়েল ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টের তুলনায় অধিক কার্যকরী। মানবদেহে ভিটামিন এ-এর শোষণ বৃদ্ধিতেও পাম অয়েলর ভূমিকা রয়েছে। 

অধিকাংশ গবেষণায় হার্ট সুরক্ষায় পাম অয়েলের ভূমিকা ইতিবাচক হলেও কিছু কিছু গবেষণায় মানবদেহে কোলেস্টেরলের বৃদ্ধির সঙ্গে পাম অয়েলের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে মনে রাখা জরুরী যে, এটা হলো সম্ভাব্য রিস্ক, যা মোটেই প্রমান করে না যে পাম অয়েল হৃদরোগের কারন। সাধারণভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমান হ্রাস এবং ভালো কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধিতে পাম অয়েলের ভূমিকা অধিকাংশ গবেষকরাই স্বীকার করেন। অনেক গবেষক এটিকে অলিভ অয়েলের “ট্রপিক্যাল ইকুইভ্যালেন্ট” হিসেবেও বিবেচনা করেন। 

শুধুমাত্র কোলেস্টেরলের হ্রাস-বৃদ্ধি দিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় নয়। এর সঙ্গে অন্যান্য অনেক বিষয় জড়িত। ১৯৯৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে যে হৃদরোগে ভূগছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতির হার মন্থর করে দিতে পারে পাম অয়েল। 

বিশ্বে মানবদেহের জন্য আদর্শ কোন ভোজ্যতেল নেই। আমরা কী তেল নিয়মিত ব্যবহার করছি তার সম্পর্কে সবারই প্রাথমিক ধারনা থাকা দরকার। একই সঙ্গে এটি মনে রাখতে হবে কী তেল বা কোন ব্র্যান্ডের তেল ব্যবহার করছি তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ। 

সামিনা জামান কাজরী,
পুষ্টিবিদ এবং সিনিয়র ব্যবস্থাপক, নেসলে বাংলাদেশ। 
[email protected] 
 

Share this post



Also on Bangladesh Monitor