চট্টগ্রাম : শ্রমিক ও কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি)সকাল থেকে এই কর্মবিরতি শুরু হয়, যা আজ বৃহস্পতিবার(৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, আন্দোলনকারী নেতারা বুধবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির কর্মসূচি দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি চলবে বলে ঘোষণা দেন। আর এ ঘোষণার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা রেলক্রসিং পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে একসময় ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরির দীর্ঘ লাইন থাকলেও এখন অচেনা পরিবেশ।
একসময়ের যানজটপূর্ণ এলাকাটি এখন একেবারে যানবাহনমুক্ত। বন্দর ব্যবহারকারীরা এ অচলাবস্থা নিরসনের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে বললেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।
কর্মবিরতির ফলে বন্দরের জেটিতে পণ্য ওঠানামা, ইয়ার্ড থেকে কার্গো ডেলিভারি, জাহাজের আগমন ও বহির্গমনসহ সব ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করেই সরকার চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এই অবস্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প নেই। সরকার চুক্তি বাতিল না করা পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন শিপিং এজেন্ট ও ফিডার অপারেটরদের কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার সকালে পাইলটেজ কার্যক্রম চালুর চেষ্টা করা হলেও আন্দোলনকারীদের বাধায় তা ব্যর্থ হয়।
বুধবার সকালে আন্দোলনকারীরা নির্ধারিত জেটিতে অবস্থান নিয়ে টাগবোট, পাইলট বোট ও মুরিং বোটসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নৌযানের নোঙর আটকে দেন। ফলে পাইলটেজ কার্যক্রম একেবারেই শুরু করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সকাল ১০টা থেকে জোয়ার শুরু হলেও জাহাজ পরিচালনার জন্য নিযুক্ত সব পাইলট কন্ট্রোল রুমে প্রস্তুত ছিলেন। তবে আন্দোলনের কারণে তারা কাজে নামতে পারেননি।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শিকদার বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দর ও দেশের ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর মধ্যে আমদানি, রপ্তানি ও খালি কন্টেইনার পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বন্দর ইয়ার্ডের ডেলিভারি পয়েন্টগুলোও ছিল ফাঁকা। কোনো শ্রমিক বা কর্মচারী কাজে যোগ দেননি। আমদানি পণ্য ছাড় ও রপ্তানি চালান বন্ধ থাকায় বন্দর ইয়ার্ড এবং আইসিডিগুলোতে কন্টেইনারের জট দিন দিন বাড়ছে।
বার্থ অপারেটরস, শিপ-হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, এভাবে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়ার ঘটনা নজিরবিহীন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সমাধান প্রয়োজন।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মঘট ও অবরোধের প্রেক্ষাপটে জরুরি সভা আহ্বান করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
আজ (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন।
সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব স্বাক্ষরিত ৪ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক পত্রে বলা হয়েছে, বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, পণ্য খালাস–লোডিং কার্যক্রমে স্থবিরতা নিরসন এবং চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে এ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সম্প্রতি শ্রমিকদের দাবি–দাওয়া ঘিরে বন্দর সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও অবরোধের মতো কর্মসূচি দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রমে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জরুরি সভা থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত এলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত ফিরবে এবং পণ্যজট কমবে।
-B