ঢাকাঃ মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ঘোষিত স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মেয়াদ আজ (৩০ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এর পরপরই দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ সারা দেশে ব্যাপক ও কঠোর অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, যা অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছেন। কর্মসূচির সময়সীমা শেষ হওয়ায় তারা এখন সরাসরি আইনি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরেননি, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, জরিমানা, আটক এবং বহিষ্কারসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৫ সালের ১৯ মে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মেয়াদ প্রথমে সীমিত সময়ের জন্য ঘোষণা করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে পেনিনসুলার মালয়েশিয়া ও ফেডারেল অঞ্চল লাবুয়ানের জন্য ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে অবৈধ অভিবাসীরা তুলনামূলক সহজ প্রক্রিয়ায়, মামলা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ২ লাখ ৪ হাজার ৫২৩ জন অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। আর মোট নিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৬১ জনে। ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে বলেন, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, বিচারিক জটিলতা ছাড়াই দেশে ফেরার সুযোগ থাকায় এটি অভিবাসীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে কাজ করেছে।
কর্মসূচির আওতায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৫০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত কম্পাউন্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিটি স্পেশাল পাসের জন্য ২০ রিঙ্গিত ফি দিতে হয়েছে। সহজ শর্তের কারণে অনেক অভিবাসী স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে কমিউনিটি নেতা কাজী সালাহ উদ্দিন বলেছেন, মালয়েশিয়ায় এখনো বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। তার মতে, অনেক অবৈধ কর্মী ঝুঁকি নিয়েও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এসব কর্মীকে বৈধতার আওতায় আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচির মেয়াদ আরও বাড়ানো এবং অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২ জন। তবে একই বছর থেকে নতুন করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ওয়ার্ক ভিসা কার্যত বন্ধ রয়েছে, ফলে শ্রমবাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়া সফর করেছে। সফরকালে তারা দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো ও শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ার কৃষি, নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও খনিজসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিবাসন ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে ১৭৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা পরবর্তী অর্থবছরে বেড়ে ২৮০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসেছে ২৩৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কঠোর ইমিগ্রেশন অভিযান, অন্যদিকে শ্রমবাজার বন্ধ—এই দ্বৈত বাস্তবতা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান এবং শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অবৈধ অভিবাসীরা কী করবেন? অনেকেই এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। তবে ইমিগ্রেশন বিভাগের বার্তা স্পষ্ট—সময় শেষ, এখন আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু।
-B