ঢাকাঃ ইতালির উপকূল মানেই চোখে ভেসে ওঠে সারি সারি বেসরকারি বিচ ক্লাব, রঙিন ছাতা আর নির্দিষ্ট ফি দিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা।
বাস্তবতা হলো, দেশটির দীর্ঘ উপকূলজুড়ে এখন ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সৈকতের আধিপত্য বিস্তৃত। তবু এই ভিড়ের মধ্যেও কিছু জায়গা এখনো আছে, যেখানে প্রকৃতি রয়ে গেছে নিজের মতো—খোলা, নির্ভেজাল ও সবার জন্য উন্মুক্ত।
ইতালিতে বসবাসরত এক অস্ট্রেলীয় নাগরিকের অভিজ্ঞতা থেকে বাছাই করা এমন ৬টি সৈকতের গল্প এখানে তুলে ধরা হলো, যেগুলো পর্যটনের চাপ এড়িয়ে এখনো নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।
মার্কে অঞ্চল: আড়ালে থাকা এক রত্ন
মধ্য ইতালির মার্কে অঞ্চল এখনো অনেকের কাছে তুলনামূলক অজানা এক গন্তব্য। বিশেষ করে সিরোলো ও পোর্তোনোভো ঘিরে থাকা উপকূলীয় এলাকা এখনো গণপর্যটনের চাপে পড়েনি।
পাইন বন ও চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা এই সৈকতগুলোর নীল-সবুজ স্বচ্ছ পানি ও সাদা নুড়িপাথরের দৃশ্য প্রথম দেখাতেই মন কাড়ে। সিরোলো সৈকতটি দীর্ঘ ও খোলা, স্বাভাবিক সৌন্দর্যে ভরপুর। পাশের পোর্তোনোভো উপসাগরে এখনো ষাটের দশকের শান্ত, অলস ইতালীয় আবহ টিকে আছে।
এই এলাকায় ১৯৫০ সাল থেকে চালু একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় ঝিনুক দিয়ে তৈরি স্প্যাগেটি স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণ। সিরোলোতে ছোট বুটিক হোটেল ও স্পা থাকলেও পরিবেশ কোলাহলমুক্ত।
গারগানো উপদ্বীপ: নির্জন প্রকৃতির ঠিকানা
দক্ষিণ ইতালির পুগলিয়া অঞ্চলের উত্তরাংশে অবস্থিত গারগানো উপদ্বীপ তুলনামূলকভাবে শান্ত একটি এলাকা। গারগানো ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চল পাথুরে খাঁড়ি, জলপাই বাগান ও চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা।
এখানকার অনেক সৈকতই মূল সড়ক থেকে দূরে অবস্থিত। পোর্তোগ্রেকো সৈকত সমুদ্রগুহায় ঘেরা, যা ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের জন্য উপযুক্ত। ভিগনানোতিকা সৈকতে উঁচু পাহাড় বিকেলের রোদ থেকে প্রাকৃতিক ছায়া তৈরি করে।
পোনজা দ্বীপ: সমুদ্রপথে রোমাঞ্চ
রোমের কাছাকাছি অবস্থিত পোনজা দ্বীপ স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্র। মূল ভূখণ্ড থেকে ফেরিতে সহজেই এখানে যাওয়া যায়।
দ্বীপের প্রধান সৈকত ফ্রনতোনে পৌঁছাতে ওয়াটার ট্যাক্সি ব্যবহার করতে হয়, যা ভ্রমণে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে। চিয়াইয়া দি লুনা সৈকতে যেতে হয় নৌকা ভাড়া করে।
পোনজার আকর্ষণ শুধু সৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় রান্নাও বেশ জনপ্রিয়। অক্টোপাস স্টু ও টাটকা ডুমুরের মিষ্টান্ন এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পান্তেলেরিয়া: আগ্নেয় শিলার দ্বীপ
সিসিলির চেয়ে তিউনিসিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত পান্তেলেরিয়া দ্বীপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির অভিজ্ঞতা দেয়। এখানে বালুকাময় সৈকত নেই—পুরো উপকূলজুড়ে আগ্নেয় শিলা।
স্থানীয়রা ও পর্যটকরা পাথরের ওপর বসে সূর্যস্নান করেন এবং সরাসরি গভীর নীল সমুদ্রে নেমে পড়েন। বালাতা দেই তুর্কি স্নরকেলিংয়ের জন্য জনপ্রিয়।
লাগেত্তো দেলে অনদিনে নামের প্রাকৃতিক জলাধারটি আগ্নেয়গিরির পাথরের মাঝে একটি প্রাকৃতিক সুইমিং পুলের মতো অনুভূতি দেয়।
এলবা দ্বীপ: ইতিহাস ও প্রকৃতির মেলবন্ধন
টাস্কান দ্বীপপুঞ্জের অংশ এলবা দ্বীপ ইতিহাস ও প্রকৃতির অনন্য সমন্বয়। প্রায় ৯০ মাইল দীর্ঘ উপকূলজুড়ে এখানে অসংখ্য ছোট ও নির্জন সৈকত রয়েছে।
নিস্পোর্তো সৈকতটি শান্ত পরিবেশ ও স্বচ্ছ পানির জন্য পরিবারসহ ভ্রমণের উপযোগী। এখানকার পানির নিচে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণেও স্নরকেলিং জনপ্রিয়।
মারেম্মা: বুনো উপকূলের দেশ
টাস্কানির মারেম্মা অঞ্চল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। গ্রোসেটোর কাছে অবস্থিত এই আঞ্চলিক পার্কে সৈকত মানেই খোলা প্রকৃতি।
এখানে নেই বিচ ক্লাব, নেই ছাতা বা বার। বালুকাময় সৈকতে কাঠ দিয়ে বানানো অস্থায়ী ছাউনি ছাড়া মানুষের উপস্থিতিও খুব কম।
মেরিনা দি আলবেরেসে সবচেয়ে পরিচিত সৈকত হলেও এখানেও ভিড় নিয়ন্ত্রিত। পর্যটকরা সাইকেল চালিয়ে আশপাশ ঘুরে বুনো ঘোড়া ও স্থানীয় গরু দেখতে পান।
প্রকৃতির মুক্ত উপকূল
সব মিলিয়ে, ইতালির উপকূল মানেই শুধু বেসরকারি সৈকত বা ভাড়া করা ছাতার গল্প নয়। একটু খোঁজ নিলেই এমন বহু জায়গা পাওয়া যায়, যেখানে প্রকৃতি এখনো মানুষের শর্তে বাঁধা পড়েনি। এই ছয়টি সৈকত তারই বাস্তব উদাহরণ।
-B