অনিয়ন্ত্রিত উমরাহ বাজারে ঝুঁকিতে হাজি ও এজেন্সি: হাব নেতাদের উদ্বেগ

সরকারি অনুমোদিত অপারেটরদের দাবিঃ দ্রুত বদলে যাওয়া উমরাহ খাতে প্রয়োজন কঠোর তদারকি

- আহমেদ তানভীর শামস Date: 17 May, 2026
অনিয়ন্ত্রিত উমরাহ বাজারে ঝুঁকিতে হাজি ও এজেন্সি: হাব নেতাদের উদ্বেগ

ঢাকা: বাংলাদেশের উমরাহ খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন সৌদি আরবে উমরাহ পালনকারী বাংলাদেশি যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর অভিযোগ—খাতটি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, ফলে প্রতারণা, আর্থিক অনিয়ম ও সেবাজনিত অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি মক্কা ও মদিনায় উমরাহ পালন করেছেন।  মহামারির পর ধর্মীয় ভ্রমণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের সহজতর ব্যবস্থাপনার ফলে এ সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

তবে খাতটির এই প্রবৃদ্ধির মাঝেও সরকারি অনুমোদিত হজ ও উমরাহ এজেন্সিগুলো বলছে, ক্রমশ উন্মুক্ত ও দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দ্য বাংলাদেশ মনিটরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাবের সভাপতি ও চ্যালেঞ্জার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গোলাম সারওয়ার এবং হাবের মহাসচিব ও গোল্ডেন বেঙ্গল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, বর্তমানে লাইসেন্সধারী এজেন্সিগুলো “অন্যায্য ও অস্থিতিশীল” ব্যবসায়িক বাস্তবতার মুখোমুখি।

উমরাহে চার লাখ বাংলাদেশি

সৌদি আরবের ধর্মীয় পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণ, সহজ ভিসা প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘নুসুক’-এর কারণে উমরাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

হজের মতো কোটা বা কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় উমরাহ সারা বছর পালন করা যায়।  ফলে এটি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশের উমরাহ যাত্রীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।  মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি, উন্নত বিমান যোগাযোগ, সহজ ভিসা প্রক্রিয়া এবং ধর্মীয় আগ্রহ বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ।

“এখন যে কেউ উমরাহ বিক্রি করতে পারে”

হাব নেতাদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো লাইসেন্সধারী এজেন্সিগুলোর জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক একচেটিয়া কাঠামোর অভাব।

সৈয়দ গোলাম সারওয়ার বলেন, “হজ পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত এজেন্সিগুলোই কাজ করতে পারে। কিন্তু উমরাহর ক্ষেত্রে এখন যে কেউ নুসুক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইনে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারছে।”

সৌদি আরবের ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে এখন ব্যক্তি বা অনানুষ্ঠানিক অপারেটররাও ভিসা, হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা স্বাধীনভাবে বুক করতে পারছেন।

যদিও এতে যাত্রীদের জন্য উমরাহ আরও সহজ হয়েছে, লাইসেন্সধারী অপারেটরদের দাবি—এতে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সারওয়ার বলেন, “অননুমোদিত ব্যক্তি বা অপারেটরদের মাধ্যমে উমরাহ পরিচালিত হলে কোনো জবাবদিহি থাকে না।  অনেক সময় যাত্রীরা প্রতারণা, হোটেল জটিলতা, পরিবহন সমস্যা বা ভিসা-সংক্রান্ত হয়রানির শিকার হন।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত এজেন্সিগুলো ভিসা, বিমান টিকিট, আবাসন, স্থানীয় পরিবহন, ধর্মীয় গাইডলাইন ও জরুরি সহায়তাসহ পূর্ণাঙ্গ সেবা দিয়ে থাকে, যা যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক অনানুষ্ঠানিক এজেন্ট অর্থ নেওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে বিদেশে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ ও দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।

১,৩০০ অনুমোদিত এজেন্সির অর্ধেক প্রায় নিষ্ক্রিয়

হাব নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১,৩০০ সরকারি অনুমোদিত হজ ও উমরাহ এজেন্সি রয়েছে। তবে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে মাত্র প্রায় ৬০০টি।

ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, “বাকিগুলো হয় নিষ্ক্রিয়, নয়তো টিকে থাকার লড়াই করছে।”

তাদের দাবি, উমরাহ বাজারের উন্মুক্ত কাঠামোর কারণে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যক্তি সহজেই ব্যবসা করতে পারছেন, অথচ লাইসেন্সধারী এজেন্সিগুলোকে কঠোর আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়।

হাব নেতাদের মতে, একটি লাইসেন্স পেতে এজেন্সিগুলোকে প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। পাশাপাশি বছরে ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নবায়ন ফি দিতে হয়।

সৈয়দ গোলাম সারওয়ার (বাম) এবং ফরিদ আহমেদ মজুমদার (ডান)

মজুমদার বলেন, “এত বিনিয়োগের পরও এজেন্সিগুলো ব্যবসা হারাচ্ছে, কারণ এখন যে কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে উমরাহ পরিচালনা করতে পারছে।”

তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বাজার ছাড়তে বাধ্য হবে, যা দেশের সংগঠিত ধর্মীয় ভ্রমণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

উমরাহ ব্যয় বাড়াচ্ছে বিমানভাড়া

হাব নেতাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে উমরাহ প্যাকেজের উচ্চমূল্যের সবচেয়ে বড় কারণ বিমানভাড়া।

মজুমদার বলেন, “বাংলাদেশে বিমান টিকিটের দাম অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এর পেছনে কর কাঠামো ও ভাড়ার ধরন বড় ভূমিকা রাখছে।”

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে উমরাহ প্যাকেজের মূল্য সাধারণ গ্রুপ প্যাকেজে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে বিলাসবহুল প্যাকেজে ৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি পর্যন্ত পৌঁছায়।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিশেষ করে রমজান ও শিক্ষা ছুটির মৌসুমে মোট প্যাকেজ খরচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্তই চলে যায় বিমানভাড়ায়।

সম্প্রতি ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণার সময় সরকার বিমানভাড়া প্রায় ১৩ হাজার টাকা কমিয়েছে। অপারেটরদের মতে, উমরাহর ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নিলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

ডিজিটালাইজেশনে বদলে গেছে বাজার

সৌদি আরবের ‘নুসুক’ প্ল্যাটফর্ম বিশ্বব্যাপী হজ ও উমরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন যাত্রীরা সরাসরি অনলাইনে ভিসা, হোটেল, পরিবহন ও পারমিট বুক করতে পারছেন।

এটি সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হলেও বাংলাদেশের এজেন্সিগুলোর মতে, দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর প্রচলিত এজেন্সি-নির্ভর ব্যবসা মডেলকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

আগে যাত্রীরা পুরো প্রক্রিয়ার জন্য অনুমোদিত এজেন্সির ওপর নির্ভর করতেন। এখন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক মধ্যস্বত্বভোগী বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজ উদ্যোগে উমরাহ আয়োজন করছেন।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এর ফলে একটি “অনিয়ন্ত্রিত উমরাহ অর্থনীতি” তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক লেনদেন সরকারি আর্থিক ও আইনি কাঠামোর বাইরে হচ্ছে।

হুন্ডি লেনদেন নিয়ে উদ্বেগ

হাব নেতারা অননুমোদিত উমরাহ কার্যক্রমে হুন্ডি ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন।

সারওয়ার ও মজুমদারের দাবি, অনুমোদিত এজেন্সিগুলো হোটেল বুকিং, পরিবহন ও অন্যান্য খরচের অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ও আইবিএএন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পাঠায়।

তবে তাদের অভিযোগ, অনেক অননুমোদিত অপারেটর হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাঠাচ্ছে।

তাদের মতে, এতে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

মজুমদার বলেন, “উমরাহ খাতে বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থাই রয়েছে এবং অনুমোদিত এজেন্সিগুলো সেটিই ব্যবহার করছে।”

তাদের দাবি, অননুমোদিত অপারেটরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষাও জোরদার হবে।

কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি

হাব এখন উমরাহ পরিচালনাকে হজের মতো নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত এজেন্সিগুলোকেই উমরাহ পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত।

সারওয়ার বলেন, “উমরাহ পরিচালনা অনুমোদিত এজেন্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও সেবার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

তাদের মতে, এতে প্রতারণা কমবে, ভোক্তা আস্থা বাড়বে, পর্যবেক্ষণ জোরদার হবে এবং লাইসেন্সধারী এজেন্সিগুলোর ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ডিজিটাল যুগে ভোক্তাদের বিকল্প কমিয়ে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের উমরাহ বাজার যখন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—কীভাবে ডিজিটাল উদ্ভাবন ও সহজলভ্যতার সঙ্গে জবাবদিহি, ভোক্তা সুরক্ষা এবং শিল্পের স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য আনা যায়।

T

Share this post



Also on Bangladesh Monitor