ঝুঁকিতে সেন্টমার্টিন: ব্যর্থ পরিবেশ অধিদফতর

লাগামহীনভাবে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকায় দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রমতে, সেন্টমার্টিনে স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ৯ হাজার হলেও প্রতিদিন রাত্রিযাপন করে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। এ কারণে প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য হারাতে বসেছে দ্বীপটি।
সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত হুমকি দিনে দিনে চরম হয়ে উঠলেও পরিবেশ অধিদফতর কয়েকটি সাইনবোর্ড, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং সভা-সেমিনারের মাধ্যমেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। এছাড়া সেখানে অপরিকল্পিত ও অনুমোদনবিহীন দোকানপাট উচ্ছেদ এবং পর্যটকদের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বীপটিতে প্রতিদিন অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকদের যাতায়াত, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, পর্যটকদের অসচেতনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে সেখানকার ইকো-সিস্টেম অর্থাৎ প্রতিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে দ্বীপটিকে বাঁচাতে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বচ্ছ নীল জলরাশি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিতে প্রতি বছর ভ্রমণে আসে হাজারো পর্যটক। পর্যটকদের চাপে দ্বীপের পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নানামুখী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ জন্য কাজ করছে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। কিন্তু আইনের প্রয়োগ চোখে পড়েনি কোথাও।
দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্লাস্টিকজাত চিপসের প্যাকেট, আচারের প্যাকেট, পলিথিন, ক্যান, চায়ের কাপ, পানির বোতল, পানির প্লাস, ডাবের খোসা, ডাবের পানি খাওয়ার স্ট্র, খাবার প্যাকেট, ভাঙা চশমা বা কাঠি, মাছ ধরার জালের টুকরো, নাইলন দড়ির টুকরোসহ বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্য। এ ছাড়া ছোট-বড় শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি সঙ্গে যোগ হয় গৃহস্থালির বর্জ্য।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, ‘দ্বীপকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা আমরা শুনি। কিন্তু বাস্তবে কিছু দেখতে পাই না।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কিছু সাইনবোর্ডে লাগানো হয়েছে কিন্তু তারা পর্যটক এবং স্থানীয়দের স্বার্থে কিছুই করে না।’
পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, 'এনভায়রনমেন্ট পিপল'র প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, সেন্টমার্টিনের বর্তমান অবস্থা দেখলে মনে হয় সেখানে কোনো প্রশাসন নেই। সেন্টমার্টিনে ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও সেখানে প্রকাশ্যে গড়ে উঠছে একের পর এক বাণিজ্যিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ। যত্রতত্র প্লাস্টিকে সয়লাব পুরো দ্বীপ ও সৈকত।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, ‘পরিবেশবিরোধী ময়লা-আবর্জনায় হারিয়ে যেতে পারে সামুদ্রিক শৈবাল ও জলজ উদ্ভিদ। নষ্ট হতে পারে দ্বীপের প্রকৃতি। এমনকি দূষণের কারণে মানচিত্র থেকে হারিয়েও যেতে পারে একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি।’
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়ে ৩দিন আগেও চার রিসোর্টকে সাড়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের অভিযান নিয়মিতই হয়। তবে পর্যটকদের সতর্ক হতে হবে।’
হাজার পর্যটকের আগমনকে ঘিরে সেন্টমার্টিনে আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। অথচ সেন্টমার্টিন দ্বীপটি নানা স্থাপনা ও দূষণের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া এটি একটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে হলে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কোনো বিকল্প নেই।
এখানে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ট বা কড়ি জাতীয় প্রাণি, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পাঁচ প্রজাতির ডলফিন, চার প্রজাতির উভচর প্রাণি, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণি, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্থন্যপায়ী প্রাণি, ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই প্রজাতির বাদুড়সহ নানা প্রজাতির বসবাস ছিল। এসব প্রজাতির অনেকগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন সময়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব জীববৈচিত্র্য। অতিরিক্ত পর্যটক ও বসবাস দ্বীপের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে।
সেন্ট মার্টিনে যেকোনো ধরণের স্থাপনা গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেগুলো উপেক্ষা করেই গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দ্বীপটির পরিবেশ ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে জানায় পরিবেশ অধিদফতর।
এসব কারণে দ্বীপটির প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ নানা জলজ প্রাণী এবং জীব-বৈচিত্র্য এখন বিলুপ্ত হবার পথে।
-B










