সৈকত বালুতে ভারী মাণিক

দেশের সমুদ্রসৈকত ও তার সন্নিহিত এলাকায় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের মিলিয়ন টন ভারী মাণিক।
বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত বালুতে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন টন ভারী খনিজ পদার্থ মিশ্রিত আছে। এগুলো যথাযথভাবে উত্তোলন ও রিফাইনারি মেশিনের মাধ্যমে আলাদা করলে এসব খনিজের আর্থিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা হবে।
সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে দেশেই এই সব খনিজ পদার্থের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি করা সম্ভব। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরে রপ্তানি করা হলে এসব খনিজ পদার্থ থেকেই সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে পারবে বলেও তারা মত প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,পরমাণু শক্তি কমিশনের নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল সৈকতের খনিজ পদার্থ নিয়ে একাধিকবার অনুসন্ধান করেছে। অনুসন্ধানের পর খনিজগুলোর বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য ব্যবহার এবং আর্থিক সম্ভাবনা নিয়েও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট (বিএমডি) খনিজসম্পদের ব্যবহার ও উৎপাদন নিয়ে কাজ করেছে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন কক্সবাজার সি বিচ এক্সপ্লোরেশন সেন্টারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা মাসুদ করিম বাংলাদেশ মনিটরকে বলেন, খনিজ আহরণে এখানে প্লান্ট স্থাপন করা হলেও মাইনিং আইনের কারণে বন্ধ রয়েছে। এক সময়ে ১৭টা স্থানে ৭/৮টি স্তুপ থাকলেও সেগুলো এখন আর নেই; সাগরের পানিতে ধুয়ে গেছে। ৯০ দশকে তৎকালীন সরকার এটি বাণিজ্যিকরণের উদ্যোগ নিতে পারতো, কিন্তু নেয়া হয়নি। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে প্রজেক্টি ২০১৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে দেশেই এই সব খনিজ পদার্থের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি করা সম্ভব। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরে রপ্তানি করা হলে এসব খনিজ পদার্থ থেকেই সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে পারবে।
তিনি বলেন, ১৯৬০ সালে কক্সবাজারে এই খনিজ সম্পদের প্রথম সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ (Geological Survey of Pakistan) কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এলাকায় মোনাজাইটের মতো তেজস্ক্রিয় মণিকের অনুসন্ধান শুরু করে এবং একই বছর কয়েকটি মূল্যবান ভারি মণিকের মজুত চিহ্নিত করে। তৎকালীন আনবিক শক্তি কমিশনের ভূতত্ত্ববিদগণ ১৯৬৭ সালে আরও অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে দেখতে পান যে সৈকত বালিতে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভারি মণিক রয়েছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ক্রমানুসারী জরিপের পর প্রমাণিত হয় যে, সমগ্র উপকূল বরাবর বিশেষ করে কক্সবাজার থেকে বদর মোকাম ও মহেশখালি, কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ি দ্বীপসমূহে ভারি মণিকের সম্ভাবনাময় মজুত বিদ্যমান রয়েছে।পরবর্তীতে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন এটি নিয়ে গবেষণা শুরু করে। সমুদ্রের বেলাভূমি থেকে খনিজ সম্পদ পৃথক করে তা আহরণের জন্য ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলীয় সরকারের সহযোগিতায় কক্সবাজারের কলাতলিতে একটি পাইলট প্রকল্প স্থাপন করা হয়। বিএইসির বিজ্ঞানীরাও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অপর একটি প্লান্ট স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে। কিন্তু এখনো এর কোনো অগ্রগতি নেই।
কালো সোনা বা ব্ল্যাক গোল্ড হল কিছু মিশ্রিত তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থ যেমন –জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট ইত্যাদি। কক্সবাজার সুবিশাল সমুদ্র সৈকতে রয়েছে অফুরন্ত কালো সোনা বা ব্ল্যাক গোল্ড।
সমুদ্র সৈকতে ঢেউ উঠে ফিরে যাওয়ার সময় ওই ভারী পদার্থগুলো সৈকতের বালুতে পড়ে থাকে। এগুলো বিভিন্ন রঙের হয়। কালো রঙের আধিক্য থাকায় এই খনিজগুলোকে বিজ্ঞানীরা ব্লাক গোল্ড বা কালো সোনা নাম দিয়েছেন। খনিজগুলো যথাযথভাবে আহরণ করতে পারলে, তা দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের খনিজ পদার্থগুলো উত্তোলন করে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে, তা দেশের শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তা ছাড়া এ খনিজ পদার্থ বিদেশে রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। প্রতিবেশী ভারত এসব খনিজ চীনসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাংলাদেশেরও সেই সুযোগ আছে।
বালুতে পড়ে থাকা এই ভারী খনিজগুলোর পরিমাণ, আর্থিক মূল্য, প্রায়োগিক ব্যবহারসহ অনুসন্ধান কার্যক্রম এবংউত্তোলন বিশেষজ্ঞরা জানান, সৈকতের বালুতে ভারী খনিজ পদার্থগুলো বাংলাদেশের সম্পদ। তা উত্তোলন না করলে সম্ভাবনাময় সম্পদ বালু হিসেবে পায়ের নিচেই থেকে যাবে।
সূত্র জানায়, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত বালুতে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন টন ভারী খনিজ পদার্থ মিশ্রিত আছে। এগুলো যথাযথভাবে উত্তোলন ও রিফাইনারি মেশিনের মাধ্যমে আলাদা করলে এসব খনিজের আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে।










