হুমকির মুখে সুন্দরবন, ভারসাম্য নষ্টের শঙ্কা

দেশের ফুসফুস হিসেবে খ্যাত, অফুরন্ত জীবিকার উৎস ও জীবন রক্ষাকারী প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। আবার তৎপরতা বেড়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের।
নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে সুন্দরবনে। অভয়ারণ্যে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে দুষ্কৃতকারী চক্রের তৎপরতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। হত্যা করা হচ্ছে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী।
এখানে নৌকা প্রতি নেয়া হয় এক হাজার টাকা। সব ঘাট ম্যানেজ করেই খুব গোপনে গাছ, মাছ ও পশু শিকার করে পাচার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন থেকে গাছ কাটা, বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়া হুমকিস্বরূপ। বাঘ থাকলে জীববৈচিত্র্য টিকে থাকে, কমে গাছ কাটা। কিন্তু চোরা শিকারিদের দাপটে সেই বাঘও হুমকির মুখে। ক্রমেই কমছে বাঘের সংখ্যা। নষ্ট হচ্ছে বাস্তুসংস্থান। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পাশাপাশি জলজ প্রাণী ও পাখ-পাখালিও হুমকির মুখে।
জানা গেছে, সুন্দরবনে ৬০ শতাংশ এলাকা অভয়াশ্রম। সেখানে চুরি করে নদীতে মাছ ধরার কাজ চলে। বৈধ যে জায়গাটুকু রয়েছে সেখানে সাধারণ জেলেরা মাছ ধরতে পারে না। মাছ ধরার বৈধ জায়গাগুলো প্রভাবশালীদের দখলে। বৈধ জায়গায় প্রভাবশালীদের কারণে মাছ না ধরতে পেরে জেলেরা অভয়াশ্রমে গিয়ে মাছ ধরে। এ ছাড়া সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। আর বিষ দিয়ে মাছ শিকারের বিষয়টি বন বিভাগের পদক্ষেপও খুব নগণ্য। সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করার জায়গায় অনেক পিছিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে স্বচ্ছ পানি ও লবণাক্ত পানি মিশ্রিত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বচ্ছ পানি কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ত পানির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। গত ২০ থেকে ৩০ বছরে সুন্দরবনের অনেক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ছে। বনের নদী-খালে মিঠা পানির প্রবাহ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এদিকে পলিমাটি জমে বনের বেশকিছু খাল ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সুন্দরবনে অতিমাত্রায় লবণাক্ততায় সুন্দরী গাছ মরে যাচ্ছে, বন্যপ্রাণীরাও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব নানা কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
সুন্দরবনের হুমকির কথা জানিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের বলেন, সুন্দরবনে উজান থেকে পানি আসছে। নদীতে একাধিক বাঁধ দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ, পানির যে প্রাকৃতিক ¯্রােত তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লবণ পানির পরিমাণ বাড়ছে। বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। বনের ভেতরে ও আশপাশে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সরকারি-ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাধিক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এসব স্থাপনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক লোক জনসমাগম ঘটে। এ ছাড়া বাঘ কমে যাওয়া সুন্দরবনের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
খুলনা বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, সুন্দরবন রক্ষা চলমান প্রক্রিয়া। বন যতদিন থাকবে ততদিন সুন্দরবন রক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের প্রধান একটি এজেন্ডা ছিল সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করা। সেটি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দরবনে আগে বিভিন্ন কাঠ বিশেষ করে সুন্দরী, কেওড়া পাচার হতো, সেটি এখন বন্ধ।
এ ছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তনের যে চ্যালেঞ্জ সেটি এখনো রয়ে গেছে। সুন্দরবন এলাকায় জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড়ের কারণে লোনা পানি বাড়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। যার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। হরিণ শিকার আগের তুলনায় কিছুটা কম হলেও আমরা একেবারে বলতে পারি না বন্ধ হয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, র্যাব, পুলিশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বন সংরক্ষণে কাজ করে চলেছি।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবন সংরক্ষণ ও এর প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া সুন্দরবনে বিভিন্ন সময় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এমন আগুনে কয়েক একর জায়গা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এদিক থেকে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানুষ সচেতন না হলে, না বুঝলে সুন্দরবন রক্ষা করা কঠিন।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কাদির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে। মিঠা পানির উৎস কমে গেছে। বনের বেশকিছু খাল পলিমাটি জমে ভরাট হয়ে আছে এবং বিভিন্ন এলাকায় চর জেগেছে। বনে লবণ পানির আধিক্য বেশি। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছ নানা রোগে মারা যাচ্ছে।
-B










