সাইকেলে কক্সবাজার থেকে এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে বীর কুমার


রাঙামাটি - রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইক্লিস্ট ও অভিযাত্রী বীর কুমার তনচংগ্যা কক্সবাজারের সমুদ্রপাড় থেকে সাইকেলে যাত্রা শুরু করে ২২ সেপ্টেম্বর নেপালের এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছেছেন।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর)স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি।
বীর কুমারের দাবি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্থলপথে সাইকেলে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম বাংলাদেশি সাইক্লিস্ট তিনি।
"সি টু হিমালয়াস এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস" নামের এ অভিযানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় কক্সবাজারের কবিতা চত্বর বিচ থেকে। গত ১৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৯ মিনিটে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে অভিযানের সূচনা করেন বীর কুমার। এরপর সাইকেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি। ভারত হয়ে শিলিগুড়ি পেরিয়ে নেপালে পৌঁছে শুরু করেন হিমালয়ের দুর্গম পথের অভিযান।
অভিযানের শুরু থেকেই প্রতিদিনের যাত্রার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন বীর কুমার। দীর্ঘ এই পথে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দুর্গম পাহাড়ি পথ ও ঝুঁকিপূর্ণ নানা পরিস্থিতি। কখনো ঝড় বৃষ্টির মধ্যে আবার কখনো দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি পথে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজ লক্ষ্য থেকে পিছপা হননি বীর কুমার।
এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগে কয়েক দিনের ব্যবধানে হিমালয়ের দুটি দুর্গম চূড়া ও একটি গিরিপথ অতিক্রম করেন তিনি। ১৮ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৮৩ মিটার উচ্চতার নাংকার্তশাং পিক চূড়ায় ওঠেন তিনি। ওই দিন বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে চূড়ায় পৌঁছান।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতার ছুকুং রি পিকের চূড়ায় ওঠেন। বিকেল ৪টা ৫১ মিনিটে সেখানে পৌঁছান তিনি। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৫৩৫ মিটার উচ্চতার কংমা লা পাস অতিক্রম করেন। সেদিন দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে কংমা লা পাসে পৌঁছান তিনি। এর পরদিনই তার গন্তব্য ছিল এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প।
লক্ষ্য শুধু হিমালয়ের দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া নয়— রক্তদান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু ন্যায্যতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাও ছিল এ অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
বীর কুমার বলেন, এই অভিযানের প্রতিটি ধাপে তাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দীর্ঘ পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল এবং শারীরিক ও মানসিক চাপ সামলে সামনে এগোতে হয়েছে। তবে দেশের মানুষের শুভকামনা, ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাকে সাহস জুগিয়েছে।
এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর বীর কুমার বলেন, এই অর্জন তার একার নয়। দীর্ঘ অভিযাত্রায় যারা সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তার লক্ষ্যগুলো পূরণ করে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা নিয়ে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান তিনি।
সাইকেল অভিযানে বীর কুমারের অভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিনের। এর আগে তিনি সাইকেলে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ক্রস-কান্ট্রি রুটও সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন। এছাড়া ভারতের ১০টি রাজ্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করে প্রায় ৭১ দিনে ৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৪ সালের মার্চে দেশে ফেরেন তিনি।
কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা বীর কুমার কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংক ও ওয়াগ্গা ভলান্টিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় রক্তদান, মানবসেবা এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তিনি।
কক্সবাজারের সমুদ্রপাড় থেকে যাত্রা শুরু করে ভারতের বাংলাবান্ধা ও শিলিগুড়ি হয়ে নেপালের দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে যেতে ৩৮ দিনের এই অভিযাত্রায় একের পর এক চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে নতুন এক অভিজ্ঞতা ও অর্জনের অধ্যায় যুক্ত হলো কাপ্তাইয়ের এই অভিযাত্রীর সাইকেলযাত্রায়।









