মার্কিন-ইসরায়েলি উড়োজাহাজে হামলার হুমকি


ঢাকাঃ ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজে পাইলটকে ছুরিকাঘাত করে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত করার কথিত চেষ্টার পর এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যাত্রী বহনকারী উড়োজাহাজে একই ধরনের হামলার আহ্বান জানিয়েছে আল-কায়েদার সমর্থক একটি প্রকাশনা।
ওই আহ্বানে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।’ ঘটনাটি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথের নিরাপত্তা এবং বিদেশি পাইলটদের যাচাই-বাছাই নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার সমর্থকদের প্রকাশিত সাপ্তাহিক প্রকাশনা ‘আল-বায়ান’ এর সর্বশেষ সংখ্যায় এই আহ্বান জানানো হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশনাটি জুলাইয়ে চালু হয়েছে এবং আল-কায়েদাপন্থীদের মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-বায়ানের ওই লেখায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইসলামবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত অন্যদের বহনকারী বিমানকে হামলার লক্ষ্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে। লেখাটিতে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পাশাপাশি ৩০ সেপ্টেম্বরের ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনারও উল্লেখ করা হয়।
আল-বায়ানের লেখায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও হামলার লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এখন আগের তুলনায় বেশি শত্রু রয়েছে। প্রকাশনাটির বক্তব্য পরে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব প্রচারণার সঙ্গে আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটা, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এই হুমকির পটভূমিতে রয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বরের ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এর ঘটনা। দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ওই বিমানে ১৭৪ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন।
উড়োজাহাজটি ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করার পর বিমানের এক সহকারী পাইলট মূল পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন এবং বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। যাত্রী ও অন্য ক্রুদের সহায়তায় হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে বিমানটি সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, হামলায় আহত পাইলট ছিলেন ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। হামলার পর ইসরায়েল দেশটিতে আসা উড়োজাহাজের পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাই আরও জোরদার করার ঘোষণা দেয়। তবে ফ্লাইদুবাইয়ের পক্ষ থেকে তখনই সতর্ক করে বলা হয়, ঘটনার বিষয়ে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোই ভালো এবং অনেক বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়।
ঘটনার তদন্তে আটক করা হয়েছে ওমানের নাগরিক সহকারী পাইলট হামাম আল-হামামিকে। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু কার্যক্রমও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে আল-কায়েদার সাবেক নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং অন্য জঙ্গি ব্যক্তিত্বদের ছবি ও ভিডিও দেখা যায়। তবে এসব পোস্ট হামাম নিজে করেছিলেন কি না, নাকি আগে থেকে নির্ধারিত বা অন্য কেউ প্রকাশ করেছিল- তা এখনো স্পষ্ট নয়। পরে তার সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো মুছে দেওয়া হয়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা হামামের সম্ভাব্য উগ্রপন্থী হয়ে ওঠার বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি ধর্মীয় কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠকের মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। তবে তদন্ত এখনো চলমান এবং হামলার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সংগঠনগত যোগসূত্র চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা এরই মধ্যে উড়োজাহাজ নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করা পাইলটদের যাচাই কতটা কার্যকর।
লন্ডন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯/১১ হামলার পর পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাই অনেক কঠোর করা হলেও কোন দেশ ও এয়ারলাইন কীভাবে সেই যাচাই করে, তাতে পার্থক্য রয়েছে। বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলটদের শুধু নিয়োগের সময় নয়, নিয়মিত স্বাস্থ্য ও মানসিক সক্ষমতার মূল্যায়নও করা হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান জানিয়েছেন, ইসরায়েলগামী প্রতিটি ফ্লাইটের পাইলটের পরিচয় ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই আরও বাড়ানো হবে। তবে ৪ অক্টোবর
ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিদেশি পাইলটদের গোয়েন্দা পটভূমি যাচাই করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই এবং বিদেশি এয়ারলাইনের পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাই মূলত সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের দায়িত্ব।
আল-কায়েদাপন্থী প্রকাশনায় নতুন করে ‘কপিক্যাট’ হামলার আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও হামলাকারীর সম্ভাব্য আদর্শিক যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত চলছে। ফলে হুমকিটি তাৎক্ষণিক কোনো হামলার প্রমাণ না হলেও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য এটি নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে একটি বিমানের ভেতরে থাকা একজন ক্রু সদস্যই যদি নিরাপত্তার বড় ঝুঁকিতে পরিণত হন, তাহলে প্রচলিত যাত্রীনিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে পাইলট ও ক্রুদের পরিচয়, মানসিক অবস্থা, আদর্শিক ঝুঁকি এবং অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থাও কতটা কার্যকর- সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।










