শতাব্দীর ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ
ঢাকাঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তারই এক নির্মম উদাহরণ এখন ইউরোপ।মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র তাপপ্রবাহ একের পর এক দেশের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। বাড়ছে প্রাণহানি, বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এটিকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপের প্রায় ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, তাপপ্রবাহের কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম ইউরোপ ছাড়িয়ে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর দিকে বিস্তার লাভ করছে।জার্মানিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী বার্লিনে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে রাস্তায় পানি ছিটানোর উদ্যোগ নিয়েছে।চেক প্রজাতন্ত্রেও তাপপ্রবাহ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। রাজধানী প্রাগের উত্তরে অবস্থিত ডকসানি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একইভাবে ডেনমার্কে প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো রেকর্ড ভেঙে পারদ উঠেছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরেও ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড টানা তৃতীয় দিনের মতো ভেঙেছে।আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যে শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। স্পেনের সরকারি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ‘মোমো’-র তথ্য অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে অতিরিক্ত গরমের কারণে ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রচণ্ড গরম থেকে মুক্তি পেতে পানিতে নামার পর দুর্ঘটনায় অন্তত ৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিকাংশ মানুষ নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকা স্থানেই সাঁতার কাটতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ‘হিট ডোম’ বা তাপগম্বুজ। বিবিসির প্রধান আবহাওয়াবিদ বেন রিচের ভাষায়, উচ্চচাপ বলয়ের কারণে বাতাস নিচের দিকে নেমে এসে সংকুচিত হয় এবং আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মেঘহীন আকাশ ও সূর্যের তীব্র তাপ সেই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে দিনের পর দিন অস্বাভাবিক গরম স্থায়ী হয়।জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই বর্তমানে গ্রীষ্মের শুরুতেই এত ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫০ বছর আগের তুলনায় বর্তমান সময়ের তাপপ্রবাহ অনেক বেশি তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রাণঘাতী। ইতোমধ্যে ইউরোপ পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নশীল মহাদেশে পরিণত হয়েছে।তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, সপ্তাহের শেষ দিকে পশ্চিম ইউরোপে তুলনামূলক শীতল বায়ুপ্রবাহ প্রবেশ করতে পারে। পরে তা ধীরে ধীরে পূর্ব ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়বে। এতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।তবুও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি প্রতিচ্ছবি। আর তাই ভবিষ্যতে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে।