মৃত প্রায় পানাম নগরীকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা

সোনারগাঁ ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর, পানাম নগরে এ ছাড়াও আছে অনেক নিদর্শন। পানাম নগরকে বিশ্বের অন্যতম মৃত শহর হিসাবে ধরা হয়। পানাম নগর এখন সংরক্ষন করছে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ। সাম্প্রতিক সময়ে এই নগরের পুরাতন দালানগুলো সংস্কার ও সংরাক্ষণের এক নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তারই অংশ হিসাবে ১৩ নম্বর ভবনটি প্রথমে সংস্কার করা হয়েছে যা দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে।
২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড বিশ্বের ১০০টি ধ্বংসপ্রায় নগরীর তালিকায় পানাম নগরের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। তবে ২০০১ সালেই বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানাম নগর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
একসময় বাংলার রাজধানী ছিলো সোনারগাঁ। তাই সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো ব্যবসা-বাণিজ্য, বন্দর আর নগরী। সোনারগাঁ চারদিক থেকে চারটি নদী দ্বারা বেষ্টিত– উত্তরে ব্রহ্মপুত্র, দক্ষিণে ধলেশ্বরী, পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা। এমন ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত। তাই ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ এর আমলে বাংলার রাজধানী ঘোষণা করা হয় সুবর্ণ গ্রামকে, যা পরে সোনারগাঁ হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৩৪৬ সালে ইবনে বতুতা চীন, ইন্দোনেশিয়া (জাভা) ও মালয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে এর সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সোনারগাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-নগরী রূপে বর্ণনা করেন।
এক সময়ে এখানে বসবাস ছিল বর্ধিষ্ণু হিন্দু ব্যাবসায়ীদের যারা নির্মাণ করেছিলেন বেশ কিছু দৃষ্টি নন্দন অট্টালিকা। ভবনগুলোতে স্থানীয় নিমার্ণ শিল্পের ছোঁয়া থাকলেও মূলত নিমির্ত হয়েছে ইউরোপীয় ও মোঘল স্থাপত্য রীতির মিশ্রণে। তারা এই এলাকা ছেড়ে গেলে এটি এক বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। ফলে সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে এবং এটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে রয়েছে বেশ কিছু ধর্মীয় স্থাপনা, যেমন- মঠ ও মন্দির।
১৯ শতকের গোড়ার দিকে ধনী হিন্দু বণিকদের দ্বারা এ নগরের প্রসার ঘটে। এ এলাকা প্রসিদ্ধ ছিলো মসলিন কাপড় ও নীল ব্যবসার জন্য।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শত শত বছর ধরে অনাদরে পড়ে থাকা, এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ পানাম নগর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো কয়েক দফায়। বিভিন্ন সময়ে নেয়া উদ্যোগগুলোর কোনোটিই কার্যকর হয়নি। একবার কাজ শুরু হলেও সে কাজ মূলত নষ্ট করছিলো হারাতে বসা এ নগরীর প্রকৃত রূপ। এতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ও সুশীল সমাজ আপত্তি করলে বন্ধ করে দেওয়া হয় সে কাজ।
সরকার ২০০৩ সালে পানাম নগরকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। ২০১৫ সালে ৬ অক্টোবর থেকে পানাম নগর পরিদর্শন করতে হলে পর্যটকদের টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পানাম নগরের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই সংস্কার করে আদিরূপ ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৩ আগস্ট ওই সংস্কার নিয়ে গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও স্থপতিদের নিয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। গত ২১ ডিসেম্বর পানাম নগরের ১৩ নম্বর ভবনটি গবেষণামূলক পাইলটিং কাজের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এখন পুরোদমে চলছে সংস্কারকাজ।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক রাখী রায় বলেন, পাইলটিং কাজের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ডিজিটাল ড্রইং ডকুমেন্টেশন, লোড বেয়ারিং ক্যাপাসিটি টেস্ট, এরিয়াল সার্ভে ও লেভেল খননের কাজ করা হয়েছে। দক্ষ কারিগরেরা গবেষকদের পরামর্শ নিয়ে কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন।










