জমে উঠেছে সোনারগাঁওয়ের কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব

জমে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের যেন ঢল নামে মেলা চত্বর এলাকায়। সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বর জুড়ে বসেছে এ মেলা। ফাউন্ডেশনই এ মেলার আয়োজন করেছে।
দেশের কৃষিজীবী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি থেকে উৎসরিত লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার লক্ষ্যে এ বছর গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী এ মেলা। এবারেও করোনা মহামারীর জন্য মেলা পেছানো হয়েছে।
প্রতি বছরই জানুয়ারিতে এ মেলা হয়।
এবারের মেলায় একটু ভিন্নতা এনেছে মেলার আয়োজক লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। মেলায় শুধুই লোকজ ঐতিহ্যের পণ্য নিয়ে সাজানো হয়েছে। লোকজ কারুপণ্য ছাড়া অন্য কোনো কিছুই প্রদর্শন ও বিক্রি হবে না। এ দিকে করোনার জন্য এবারে মেলায় কারুশিল্পীও কম এসেছে। স্টল বসেছে কম। তারপরেও এ মেলা যেন পুরো বাংলাদেশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সোনারগাঁওয়ে এ লোকজ উৎসবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প থেকে শুরু করে সোনারগাঁওয়ের হাতি ঘোড়া, জামদানি, রাজশাহীর শখের হাড়ি, বাঁশবেত, সোনারগাঁওয়ের দারুশিল্প, নকশীকাঁথা, টেপা পুতুল, সিলেট ও মুন্সীগঞ্জের শীতলপার্টি, কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্প, মাগুরা শোলা শিল্প সবই আছে এই মেলায়।
মেলার বিশেষ আকর্ষণ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রদর্শনী দেশের প্রথিতযশা কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে ‘কর্মময় কারুশিল্পী’ প্রদর্শনী। এটি মেলার মূল চত্বরের মাঠের মাঝে অবস্থান। এ প্রদর্শনীতে ২৪টি স্টলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ৪৮ কারুশিল্পী দেশের হারানো ঐতিহ্যকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করছে।
প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলো কারুশিল্পীরা তাদের স্বহস্তে তৈরি করছে সোনারগাঁওয়ের দারুশিল্পের কারুকাজ, হাতি ঘোড়া, পুতুলের বর্ণালী-বাহারি পণ্য, জামালপুরের তামা-কাঁসা-পিতলের শৌখিনসামগ্রী, সোনারগাঁওয়ের বাহারি জামদানি শিল্প, বগুড়ার লোকজ বাদ্যযন্ত্র, কক্সবাজারের শাঁখা ঝিনুক শিল্প, মুন্সীগঞ্জের শীতলপাটি, ঢাকার কাগজের শিল্প, রাজশাহীর মৃৎশিল্প-মাটির চায়ের কাপ, শখের হাঁড়ি, বাটিক শিল্প, খাদিশিল্প, মণিপুরী তাঁতশিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি শিল্প, টাঙ্গাইলের বাঁশ-বেতের কারুপণ্য, সিলেটের বেতশিল্প, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুজনিকাঁথা, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা পুতুল, খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, মৌলভীবাজারের বেতের কারুশিল্প, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশের কারুশিল্প, মাগুরার শোলাশিল্প, চট্টগ্রামের তালপাতার হাতপাখা, পাটজাত কারুপণ্য, লোকজ অলঙ্কার শিল্পসহ ইত্যাদি কারুপণ্য। এখানে শিল্পীরা বসেই তাদের নিপুণ হাতে নিজস্ব মেধা ও মননে তৈরি করছে বাহারি কারুপণ্য এবং তা প্রদর্শন ও বিক্রি করছে। প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলোতে থরে থরে সাজানো কারুপণ্যের পসরা দেখে কেউ কেউ লোভ সামলাতে না পেরে কেনাকাটা করছেন শখের চিত্রিত হাঁড়ি, শোলা শিল্প, কাঠেরসামগ্রী, শতরঞ্জি, নকশী কাঁথাসহ বিভিন্ন কারুপণ্য সামগ্রী।
এককথায় বলতে গেলে দারুণ এক আয়োজন বসেছে সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে।
তবে এবার মেলা করোনার জন্য ছুটির দিনগুলোতে একটু বেশ ভালো জমে অন্য দিনের চেয়ে। মেলা দেখে আর কারুপণ্য কিনে ক্লান্ত শরীরে বিকেলে বসে শুনছেন ময়ূরাকৃতির সোনারতরী মঞ্চ থেকে ভেসে আসা লালন, হাসন, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর ভাটিয়ালি গান। কেউ কেউ আবহমান বাংলার গ্রাম্য সালিস, দাদী নাতির গল্প বলা, ঢেঁকিতে ধানভানা, নকশী পিঠা তৈরি, পালকিতে বর কনে, পণ্ডিত মশাইয়ের পাঠশালা ইত্যাদি জীবন্ত প্রদর্শনী ও হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সব খেলাধুলা দেখছে। সোনারগাঁও বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এতে অংশগ্রহণ করছে। মেলায় বরাবরই নাগরদেলা, বায়োস্কোপ, বিমান চড়কি রয়েছে।
মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. আহমেদ উল্লাহ জানান, লোক কারুশিল্পের প্রসারের জন্য প্রতি বছরের মতো আকর্ষণীয় বিভিন্ন খেলা, গান, প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের উৎসবে গ্রাম বাংলার আর্থসামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে বৈচিত্র্যময়ভাবে। তিনি বলেন, এবারে করোনার জন্য মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে মার্চ মাসে। এবারো শুধু লোকজ কারুপণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে মেলাটি। গত মেলা থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এবারের মেলায় মোট স্টল রয়েছে ১০০টি। মুড়ি মুড়কি, মণ্ড মিঠাই থেকে শুরু করে গ্রামীণ হস্তশিল্প, বাঁশবেত, কাঠ, লোহা, পাটজাত দ্রব্যসামগ্রী বিলুপ্ত প্রায় কুটির শিল্পের পসরা বসেছে মেলায়। আগামী ২৩ মার্চ পর্যন্ত মেলা চলবে।
-B










