আহত পাখি নিজেই হাসপাতালে

ঢাকাঃ জার্মানির ব্রেমেন। একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কাঁচের দরজায় হঠাৎ ঠক ঠক শব্দ। ভেতরে ব্যস্ত চিকিৎসক–নার্সরা প্রথমে ভেবেছিলেন—হয়তো বাতাসে উড়ে আসা কিছু লেগেছে। কিন্তু শব্দ থামছে না। দরজার ওপাশে কেউ যেন মরিয়া হয়ে ঠোকরাচ্ছে। কাছে গিয়ে তাকাতেই তারা দেখলেন, একটি কালো জলচর পাখি, লম্বা গলা, ধারালো ঠোঁট… আর সেই ঠোঁটেই গেঁথে আছে তিন-কাঁটা মাছ ধরার বড়শি।
জানা যায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলের এই শহরের ক্লিনিকাম লিংকস ডার ওয়েসার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দরজায় এসে হাজির হয় একটি করমোরান্ট—বাংলায় যাকে আমরা পানকৌড়ি গোত্রের পাখি বলি।
খবরে বলা হয়েছে, পাখিটির ঠোঁটে আটকে ছিল ফিশিং হুক বা কাঁটাওয়ালা বড়শি। কাঁচের দরজায় বারবার ঠোকর মেরে সে যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—‘আমাকে বাঁচান।’
হাসপাতালের কর্মীরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় পাখিটিকে ধরে সতর্ক হাতে বড়শিটি খুলে ফেলা হয়, ক্ষত পরিষ্কার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে হাসপাতাল চত্বরে থাকা পার্ক এলাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়—আবার প্রকৃতির কোলে।
ফায়ার সার্ভিসের বিবৃতিতে বলা হয়, সাধারণত পানকৌড়ি মানুষের কাছে আসে না। তারা স্বভাবতই লাজুক ও দূরত্ব বজায় রাখা পাখি। কোনো আহত পানকৌড়ি যদি মানুষের দ্বারস্থ হয়, সেটি চরম বিপদের ইঙ্গিত—সে তার স্বাভাবিক ভয় হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ যন্ত্রণাই তাকে ঠেলে এনেছে মানুষের দরজায়।
লম্বা গলা, ত্রিভুজাকৃতির মাথা আর হুকের মতো বাঁকানো ঠোঁট এই পাখিদের বৈশিষ্ট্য। ইউরোপজুড়ে নদী, হ্রদ ও উপকূল এলাকায় এদের দেখা যায়। জার্মানির নদীবিধৌত অঞ্চলগুলোতে পানকৌড়ি অস্বাভাবিক নয়। তারা পানির নিচে ডুব দিয়ে মাছ ধরে। কিন্তু মাছ ধরার সরঞ্জাম—বিশেষ করে ফেলে রাখা বড়শি ও সুতা—তাদের জন্য ভয়াবহ ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠোঁটে বড়শি গেঁথে থাকলে পাখি ঠিকমতো খাবার ধরতে পারে না। সংক্রমণ, তীব্র ব্যথা, এমনকি অনাহারে মৃত্যুও হতে পারে। বড়শির কাঁটা যদি গভীরে ঢুকে যায়, তা খুলতে দেরি হলে ক্ষত আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবহেলায় ফেলে রাখা ফিশিং লাইন ও হুকের কারণে জলচর পাখির আহত হওয়ার ঘটনা আগেও নথিভুক্ত হয়েছে।
জার্মান নেচার কনজারভেশন ইউনিয়ন নাবু ও অন্যান্য সংস্থাও বহুবার এ বিষয়ে সতর্ক করেছে—মাছ ধরার পর সরঞ্জাম সঠিকভাবে সংগ্রহ না করলে তা পাখি, কচ্ছপসহ নানা প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
এই ঘটনায় বিস্ময় জাগায় আরেকটি প্রশ্ন, পাখিটি কি সত্যিই সাহায্য চাইতে এসেছিল?
প্রাণীবিজ্ঞানীরা বলেন, বন্য প্রাণী সচেতনভাবে ‘হাসপাতাল’ চেনে না। কিন্তু তীব্র যন্ত্রণা ও বিভ্রান্তির মুহূর্তে তারা আলো, শব্দ বা মানুষের উপস্থিতির দিকে এগোতে পারে। কাঁচের দরজায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বা ভেতরের আলো দেখে পাখিটি হয়তো ঠোকরাতে শুরু করেছিল। কিন্তু মানুষের চোখে তা যেন এক মরিয়া আবেদন—বাঁচার আকুতি।
ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই অনেকেই লিখেছেন, মানুষের দরজায় এসে কড়া নাড়ল এক আহত পাখি। শহরের ব্যস্ত হাসপাতাল আর এক বন্য প্রাণীর হঠাৎ সাক্ষাৎ যেন মনে করিয়ে দিল—আমাদের অবহেলা কারও জীবনে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। একটি ছোট বড়শি, ফেলে রাখা এক টুকরো সুতা—সেটাই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুফাঁদ।
ভাগ্য ভালো, সেই রাতে কাঁচের দরজার শব্দ কেউ উপেক্ষা করেননি। চিকিৎসক-ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উদ্যোগে পাখিটি আবার উড়তে পেরেছে। হাসপাতালের পার্কে ছেড়ে দেওয়ার পর সে ডানা ঝাপটে দূরে সরে যায়—সম্ভবত নদীর দিকে, নিজের জগতে।
এই ঘটনা আমাদের জন্যও এক নীরব বার্তা রেখে যায়। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল দূর থেকে উপভোগের নয়; দায়িত্বেরও। একটি বড়শি যেখানে এক পাখির ঠোঁটে গেঁথে যায়, সেখানে মানবিকতা আর সচেতনতার ছোট্ট উদ্যোগই পারে জীবন ফিরিয়ে দিতে।
-B










