বিধ্বস্ত জেট , ভাঙা হাড়—তবু বাঁচলেন পাইলট


ঢাকাঃ ইরানের ভূখণ্ডে উড়োজাহাজ ভূপাতিত হওয়ার পর দীর্ঘ ৫০ ঘণ্টা ধরে শত্রুবেষ্টিত পাহাড়ি এলাকায় চরম টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে জীবনে বেঁচেছেন এক মার্কিন পাইলট।
ঘটনাটি ঘটেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরিচালিত একটি অভিযানে, যেখানে ইরানের কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয় একটি আমেরিকান যুদ্ধউড়োজাহাজ। ওই উড়োজাহাজে থাকা দুই কর্মকর্তার মধ্যে এক কর্মকর্তা দ্রুত উদ্ধার পেলেও অপর কর্মকর্তা, যিনি ‘ডিউড ৪৪ ব্র্যাভো’ কল সাইনে পরিচিত, বহু ক্ষত নিয়ে শত্রু সীমানায় আটকে থাকেন।
নিরাপত্তা জনিত কারণে নিজের আসল নাম প্রকাশ না করে সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ব্র্যাভো এই রোমহর্ষক ঘটনাকে আধুনিক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গত ২ এপ্রিল মধ্যরাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান এডমিরাল ব্র্যাড কুপারের নেতৃত্বে ইসফাহানের দক্ষিণে ইরানের পরমাণু উপাদান ও ড্রোন তৈরির কারখানা সংলগ্ন এলাকা লক্ষ্য করে একটি আক্রমণাত্মক মিশন পরিচালনা করা হচ্ছিল। সেই মিশনে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৩০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের দুটি আসনবিশিষ্ট এফ-১৫ই যুদ্ধউড়োজাহাজটিতে ইরানের প্রায় ১ লাখ ডলার মূল্যের একটি কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে।
ওই মুহূর্তের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্র্যাভো জানান, উড়োজাহাজের গায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতটি ছিল ঠিক যেন একটি দ্রুতগামী পণ্যবাহী ট্রেন এসে সজোরে ধাক্কা দেওয়ার মতো। উড়োজাহাজের পাইলট ‘আলফা’ উড়োজাহাজটিকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত দুজনেই উড়োজাহাজ থেকে ইজেক্ট (জরুরি নির্গমন) করার সিদ্ধান্ত নেন।
ইজেক্ট করার সময় ব্র্যাভোর প্যারাশুটটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আকাশে থাকা অবস্থায় প্যারাশুট না খোলার মুহূর্তটিকে জীবনের সবচেয়ে ভীতিকর সময় উল্লেখ করে ব্র্যাভো বলেন, এক পর্যায়ে আমি যখন উপরে তাকিয়ে দেখলাম কোনো প্যারাশুট নেই, সেটা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে ভীতিকর দৃশ্য। ঠিক তখনই আমি থেমে মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম; প্রভু, তোমার যা ইচ্ছা তা-ই হোক, তবে আমি যদি এটি পার করতে চাই, তবে আমার সাহায্যের প্রয়োজন। প্রায় মুক্তভাবে আকাশ থেকে অতি দ্রুতগতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ার কারণে তার মেরুদণ্ড, এক হাত এবং কাঁধের হাড় ভেঙে যায়।
ভূমি স্পর্শ করার পর ব্র্যাভো দেখতে পান তিনি দুই দিকে খাড়া পাহাড় পরিবেষ্টিত একটি উপত্যকায় অবস্থান করছেন। পাইলট আলফা তার থেকে প্রায় ৫ মাইল দূরে নিরাপদে নেমেছিলেন এবং তাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু ব্র্যাভো চরম আহত অবস্থায় প্রায় অলৌকিকভাবে উঠে দাঁড়ান এবং জীবন বাঁচাতে ও শত্রুর চোখ এড়াতে পাহাড়ের উপরের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভেঙে যাওয়া মেরুদণ্ড ও হাড়ের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ে উঠে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।
অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছুটা রসিকতার ছলে ব্র্যাভো বলেন, কখনো অনুপ্রাণিত না থাকার কারণে নিজেকে ইরানি টিভিতে বন্দি হিসেবে দেখতে দেওয়া যাবে না। আঘাত থাকা সত্ত্বেও আমরা সবাই প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ পাই, তাই ল্যান্ডিং স্থান থেকে যত দ্রুত সম্ভব আমি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।
ব্র্যাভোর নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে গভীর রাতে ঘুম থেকে তোলা হয় এবং সেনা কর্মকর্তা জীবিত বা মৃত যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন তাঁকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পরপরই আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়, যেখানে আকাশে শত শত এবং সমর্থনে হাজার হাজার সেনা নিয়োজিত করা হয়। ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি ৯০ জনেরও বেশি বিশেষ মার্কিন সেনা সদস্যকে পাঠানো হয়, যা গত ৪৬ বছরের মধ্যে ইরানি মাটিতে প্রথম মার্কিন পদাতিক বাহিনীর উপস্থিতি।
ব্র্যাভো প্রায় দুই দিন ধরে খাদ্য ও পানীয় ছাড়া পাহাড়ের খাঁজে আত্মগোপন করে ছিলেন, যখন ইরানি সেনারা তার কয়েকশো মিটারের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছিল। আমেরিকান বাহিনী একটি গোপন যোগাযোগ বার্তার মাধ্যমে তার অবস্থান সনাক্ত করে। চূড়ান্ত উদ্ধারের আগে সিআইএ কৌশলগত বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইরানি বাহিনীকে ভুল পথে চালিত করে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী ড্রোন ও বোমারু জেট ব্যবহার করে ব্র্যাভোর আশেপাশের এলাকা থেকে শত্রু বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দীর্ঘ প্রায় ৫০ ঘণ্টার উদ্ধার তৎপরতার পর মার্কিন স্পেশাল ফোর্স যখন পাহাড়ি রিজলাইনে ব্র্যাভোর কাছে পৌঁছায়, তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলেন, চলুন যাওয়া যাক। উদ্ধার পাওয়ার সেই আবেগঘন মুহূর্তটিকে ব্র্যাভো নিজের জীবনের অন্যতম সেরা সময় হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে সফলভাবে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।










