ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরি বাড়ছে


ঢাকাঃ গোটা ইউরোপজুড়ে শিল্পকর্ম চোররা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
গত সপ্তাহের শুরুতে ফ্রান্সের একটি জাদুঘর থেকে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়ারের ৪টি চিত্রকর্ম চুরি হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আবারো সামনে এল। চিত্রকর্মগুলোর মূল্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো।
ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল গত মাসেই সতর্ক করে বলেছিল, ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরির ঘটনা ক্রমেই আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠছে।
রেনোয়ারের চিত্রকর্ম চুরি হওয়ার কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পকর্ম অনুসন্ধানকারী আর্থার ব্র্যান্ড বলেছিলেন, আরো বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটতে পারে। গত অক্টোবরে প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে সফল চুরির পর এ ধরনের ঘটনা বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। ল্যুভর থেকে চুরি যাওয়া ৮ কোটি ৮০ লাখ ইউরো মূল্যের গয়না এখনো উদ্ধার হয়নি।
রেনোয়ার জাদুঘরের ঘটনায় চুরি হওয়া অনেক মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে ২টি চোররা জাদুঘরের বাগানে ফেলে যাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার করা হয়।
ইউরোপোল জানিয়েছে, প্রায় ২ বছর আগে থেকে ইউরোপজুড়ে তাদের কাছে জাদুঘরে চুরির ঘটনা বাড়তে শুরু করে। চুরির পদ্ধতি ও লক্ষ্যবস্তুও বদলেছে। এখন চোরেরা আরো শক্তিশালী ও সহিংস কৌশল ব্যবহার করছে এবং মূল্যবান ধাতু ও রত্নের মতো উচ্চমূল্যের সামগ্রীকে বেশি লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
জাদুঘর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বুলুত মনে করেন, ল্যুভরে চুরির পরের অনেক ঘটনাই সেই চুরির অনুকরণে ঘটানো হয়েছে।
শিল্প অপরাধবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এআরসিএ বলছে, সাম্প্রতিক চুরিগুলোয় ছোট, সহজে বহনযোগ্য ও দ্রুত নিয়ে যাওয়া যায় এমন বস্তু বেশি লক্ষ্য করা হচ্ছে। ফ্রান্সে জাদুঘর চুরির ঘটনা ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল এবং ২০২৫ সালেও কিছুটা বেড়েছে।
জাদুঘরগুলো কেন লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে—এ বিষয়ে ব্র্যান্ড বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থার দিক থেকে গয়নার দোকান ও ব্যাংকের তুলনায় জাদুঘরগুলো সহজে চুরি করার মতো জায়গা। অনেক জাদুঘর পুরনো ভবনে অবস্থিত, যেগুলো আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় সুরক্ষিত করা কঠিন। আবার জাদুঘর সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকায় দর্শনার্থীর ছদ্মবেশে অপরাধীরা সহজেই ভেতরে ঢুকতে পারে।
রেনোয়ার জাদুঘরের চুরিটি মাত্র ৫ মিনিটে শেষ হয়েছিল। ইউরোপোলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে চোররা প্রতারণার আশ্রয় নিলেও এখন চুরি ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। তারা ভেতরে ঢুকতে হাতুড়ি, কুঠার, লোহার শাবল এমনকি বিস্ফোরকও ব্যবহার করছে।
ল্যুভরে চোররা যান্ত্রিক লিফট ব্যবহার করে জানালায় পৌঁছে, শক্তিশালী যন্ত্র দিয়ে কাচ কেটে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের হুমকি দিয়ে গয়না নিয়ে যায়। রেনোয়ারের জাদুঘরে বৈদ্যুতিক ছুরি দিয়ে বেড়া কেটে চিত্রকর্মের ফ্রেম ধরে রাখা কাঠামো কেটে ফেলা হয়।
চোররা কী চুরি করছে, সেটিও বদলেছে। চিত্রকর্ম বিক্রি করা কঠিন হওয়ায় প্রায় এক দশক আগে থেকে চোররা সহজে বিক্রি বা সরিয়ে ফেলা যায় এমন সামগ্রীর দিকে ঝুঁকেছে। এখন মূল্যবান ধাতু, রত্ন ও চীনা চীনামাটির মতো সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীও বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। মূল্যবান ধাতু গলিয়ে ফেললে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তা শনাক্ত করা কঠিন হয়।
চুরি ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য চুরি পুরোপুরি অসম্ভব করে তোলা নয়; বরং চোরদের এতটা সময়ক্ষেপণ করানো, যাতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। অতিরিক্ত ভারী দরজা, শক্ত কাচ, কুয়াশা তৈরির যন্ত্র এবং সমন্বিত অ্যালার্ম ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে ছোট শহরের জাদুঘরগুলোর জন্য নিরাপত্তায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা বড় চ্যালেঞ্জ।
ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লায়েড আর্টসের পরিচালক লিলি হোলাইন বলেন, নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি জাদুঘরকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখাও জরুরি। তার ভাষায়, ‘একটি জাদুঘর দুর্গ হতে পারে না।’










