নতুন ভেন্যুতে যেমন চলছে ঢাকা বাণিজ্য মেলা

করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে নতুন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার (ডিআইটিএফ) ২৬তম আসর।
এ বছরই বাণিজ্য মেলা পেয়েছে তার নিজস্ব ঠিকানা৷ ঢাকার উপকণ্ঠে পূর্বাচলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারের স্থায়ী কমপ্লেক্সে মেলার আয়োজন করা হয়েছে৷ ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে মাসব্যাপী৷
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর যৌথ আয়োজনে ১৯৯৫ সাল থেকে চলে আসছে এ মেলা৷
নতুন ভেন্যুতে কেমন চলছে মেলা!
এবারের মেলায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ২৩টি প্যাভিলিয়ন, ২৭টি মিনি প্যাভিলিয়ন এবং ১৬২টি স্টল রয়েছে। এসব স্টলকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৩৬৬ বর্গমিটার আয়তনের দুটি হলে। আর কমপ্লেক্সের বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু প্যাভিলিয়ন ও মিনি প্যাভিলিয়ন।
এ ছাড়াও মেলায় রয়েছে ক্রোকারিজ, মেশিনারিজ, প্লাস্টিক, দেশীয় বস্ত্র, কসমেটিক্স, অলঙ্কার, খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্যের সমাহার৷
মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে জানা গেছে,মেলার ভেন্যু ঢাকা থেকে বেশ দূরে হওয়ায় এখন পর্যন্ত পণ্যের ক্রেতাও আশানুরূপ নয়। তাই বড় কোম্পানিগুলো বিক্রির চেয়ে পণ্যের অনলাইন প্রদর্শনী ও প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ জেল কর্তৃপক্ষের আয়োজনে জেলখানার কয়েদীদের বানানো পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘কারা পণ্য নামের একটি স্টল৷ সেখানে ২৫ টাকা থেকে শুরু করে ৮০০০ টাকা দামের প্রায় ২০০ রকমের পণ্য আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা৷ সুলভ মূল্য ও টেকসই উপকরণ হওয়ায় মেলার শুরু থেকেই তারা ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলেন জানান একজন বিক্রয় প্রতিনিধি৷
নেই ছাড়ের ছড়াছড়ি
নতুন ভেন্যুতে আয়োজিত বাণিজ্য মেলায় অন্যবারের মতো ছাড়ের ছড়াছড়ি দেখা যায়নি৷ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, এবার শুরু থেকে সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করছে৷ এজন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়াতে কেউই তেমন ছাড়ের অফার দিচ্ছেন না৷
ক্রেতাদের মধ্যে যাঁরা আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্যের স্টল ঘুরে দেখছেন, তাঁদের মধ্যে কেনার আগ্রহ তেমন দেখা যায়নি। তাঁদের ভাষ্য, এত দূর থেকে আসবাব বা ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এতে খরচ যেমন অনেক বেশি পড়বে, তেমনি ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে পণ্য পরিবহন করাও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সে জন্য তাঁরা মেলা থেকে এসব পণ্য কেনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে এসব যা কিছু বিক্রি হচ্ছে, আশপাশের মানুষেরাই তা কিনছেন।
মেলায় নাদিয়া ফার্নিচারের স্টল ত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা থেকে এসে সরাসরি পণ্য কিনছেন না কেউ, সে জন্য আমরা প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’
কেনাকাটায় মন্দা
মেয়েদের ব্যাগ, শালসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ভারতের রাজস্থান থেকে বাণিজ্য মেলায় এসেছেন দীনেশ ইসরানি৷ এ নিয়ে চারবার ঢাকার বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করছেন৷ কিন্তু এবার অন্যবারের মতো ক্রেতা পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি৷ তার মতে, এত দূরে ধনী খদ্দেররা আসেন না, যারা আসেন তারা সবাই মধ্যবিত্ত৷ তাই আগারগাঁয়ে যে ব্যবসা হতো এখানে তার অর্ধেকও হচ্ছে না৷ এভাবে চললে বড় লোকসানে আশঙ্কা তার৷
চড়া দাম
ঢাকার মিরপুর থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এসেছেন শামীম ও নাসরিন৷ সদ্য বিবাহিত এ দম্পতি জানান, নতুন সংসারের জন্য তারা এখানে শখ করে কেনাকাটা করতে এসেছেন৷ কিন্তু বিক্রেতারা বাজারের চেয়েও দ্বিগুন-তিনগুন বেশি দাম চাচ্ছেন বলে অভযোগ তাদের৷ তাই তেমন কিছু না কিনেই চলে যাচ্ছেন তারা৷
দুপুরের পরে ভিড়
বাণিজ্য মেলার রীতি অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এবং বিকালের পর ভিড় বাড়তে দেখা যায়৷ শুক্র ও শনিবার থাকে কিছুটা ভিড়৷
এক ছাদের নিচে গোটা আয়োজন
ঢাকার পূর্বাচলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারের ৩৩ হাজার বর্গমিটারের সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন কমপ্লেক্সে চলছে মেলা৷ একাধিক দর্শনার্থী জানিয়েছেন, আগে আগারগাঁওয়ে উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে রোদে মেলায় ঘুরতে কষ্ট হতো৷ এখানে ছাদের নিচে প্রায় পুরো আয়োজন৷ এছাড়া মেলার পরিচ্ছন্নতা নিয়েও সন্তুষ্ট তারা৷
নেই স্বাস্থ্যবিধি
করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হলেও মেলায় প্রবেশের পর থেকেই স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্ব মানার তোয়াক্কা করতে দেখা গেল না অনেককে৷ মুখে মাস্ক নেই, ধাক্কাধাক্কি করে মেলায় প্রবেশ, স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভীড়সহ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার বিষয়গুলো সহজেই চোখে পড়ে৷
ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম
এবারের বাণিজ্য মেলার শুরু থেকেই জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে৷ ভোক্তারা যেন প্রতারণার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করাই এ কার্যক্রমের অংশ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা৷
যা বললেন ইপিবি সচিব
মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সচিব ইফতেখার আহমেদ বলেন, মেলার দুটি হল রুমে বড় দ্বিতল স্টল দেওয়ার সুযোগ নেই। বড় কোম্পানিগুলো যাতে আগারগাঁওয়ের মতো দ্বিতল স্টল দিতে পারে, সে জন্য হলরুমের বাইরে খোলা স্থানে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানিগুলো নিলামের মাধ্যমে সেই সব স্টল বুঝেও নিয়েছিল। পরে তারা হঠাৎ হলরুমে স্টল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন স্থানে বিক্রি কম হবে—এমন আশঙ্কা থেকে অনেকে বড় স্টল দিতে চায়নি বলে জানান তিনি।










