দেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক

ঢাকাঃ আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
সংস্থাটি বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং আউটলুক বা পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে পরিবর্তন করে নেতিবাচক অবস্থানে নামিয়ে এনেছে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান বা আইডিআর আগের মতোই ‘বি প্লাস’ বহাল রাখা হয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ রেটিং প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিচ।
ফিচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক আসে এ অঞ্চল থেকে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশই ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে, যা দিয়ে প্রায় ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে ফিচ মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ বাফার বা সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে ধীরগতি এবং খেলাপি ঋণের উচ্চহারকে রেটিং অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফিচ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে। এর বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে আসায় বিনিয়োগের গতিও মন্থর হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ।
ফিচ পূর্বাভাস দিয়েছে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। পরের অর্থবছরে এটি আরো কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ থাকলেও বাস্তবে তা ৮ দশমিক ৭১ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা নিয়ে বরাবরের মতো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। আয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সরকারের আয়ের ২৯ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ মেটাতে। এটি অভ্যন্তরীণ বাজেট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ফিচ সতর্ক করেছে, যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পতন অব্যাহত থাকে, সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয় কিংবা ব্যাংক খাত সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা যায়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মূল রেটিং আরো কমিয়ে দেয়া হতে পারে। তবে ব্যাংক খাতে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরলে এ নেতিবাচক পূর্বাভাস থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
-B










