ভাষা স্মরণে আজও গড়ে ওঠেনি কোন জাদুঘর

১৯৫২ সালের রক্তঝরা একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতিসত্তার চাবিকাঠি। '৪৭ পরবর্তী জাতীয় জীবনে সব গণজাগরণ, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনার মূলে জড়িয়ে আছে ফেব্রুয়ারি মাসের স্মৃতি। ’৫২'র ভাষা আন্দোলন জাতির সংগ্রামী চেতনার মহাকাব্য।
এটি কোনো সাধারণ সন তারিখ নয়। এটি শোক, প্রেরণা, শপথ আর অঙ্গীকারের মিলিত স্রোতোধারা। ২১-এর পথ ধরেই বাঙালি হেঁটেছিল স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার দিকে। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে বাংলাদেশের মানুষ।
২১ ফেব্রুয়ারি একই সাথে শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি দেশের সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্প্রসারিত। আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি।
কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যে ভাষা আন্দোলন পথ দেখিয়েছে মুক্তির সেখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত হলেও আজ অবধি গর্ব ও অহংকারের ৭০ বছরেও ভাষা সংগ্রামীদের জন্য তৈরী হয়নি কোন জাদুঘর, দেয়া হয়নি কোন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা।
ভাষা সৈনিক স্মরনার্থে একটি জাদুঘর নির্মাণে এক চিলতে জায়গা বরাদ্দের জন্য ১৯৫২'র সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্ববায়ক কাজী গোলাম মাহবুব'র পরিবার সরকারী বিভিন্ন দফতরে বারবার ঘুরেও এতটুকু সহানুভূতিও না পেয়ে নিজ বাসভবনেই ভাষা আন্দোলনের সময়ের ক্যাপসনসহ দূর্লভসব ছবি নিয়ে তিনতলা বাড়িটির নিচতলার দুটি কক্ষ নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে গড়ে তুলেছেন ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর।
এখানে স্তরে স্তরে গাদাগাদি করে সাজানো রয়েছে ভাষা আন্দোলনের দুর্লভ সব ছবি।
জাদুঘরের দেয়াল জুড়ে রয়েছে ফ্রেমে বাঁধাই করা বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামীদের ছবি, পরিচিতি ও অবদান। আছে ভাষা আন্দোলনের দুর্লভ কিছু ছবিও। ১৯৫২, ৫৩ বা তারও আগে তোলা ভাষা আন্দোলন এবং শহীদ মিনারের সাদা-কালো ছবি, স্মারকগ্রন্থ, বর্তমান শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তরের ছবি, প্রথম শহীদ মিনারের ছবি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে তমদ্দুন মজলিশ কর্তৃক ১৯৪৭-এর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল মনসুর আহমেদের লেখা ‘পাকিস্তানের রাষ্টভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা। একমাত্র এই জাদুঘরেরই সংগ্রহে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ও সিলেটের ‘নওবেলাল’ পত্রিকার মূল কপি। ভাষাসংগ্রামী কাজী গোলাম মাহবুবের ব্যবহার সামগ্রী; কোট, ডায়েরি, টুপি, চাবির রিং, সম্মাননা পদক ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন ভাষা সংগ্রামীদের ব্যবহৃত ডায়রি, কলম, টেনজিস্টারও রয়েছে জাদুঘরে।
সাধারণ দর্শনার্থীরা শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে পারে। কোনো প্রবেশ মূল্য দিতে হয় না। কিন্তু সাধারণের খুব একটা যাতায়াত নেই এই বাড়িতে। গবেষক, ভাষা সৈনিকরা এবং ফেব্রুয়ারি মাস এলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ও সংবাদকর্মীরা আসেন এই ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরে।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান কাজী গোলাম মাহবুবের স্ত্রী পেয়ারী মাহবুব বাংলাদেশ মনিটরকে বলেন, ভাষা সৈনিক কাজী গোলাম মাহবুবের মৃত্যুর পর তার পরিবার জাদুঘরটির দায়িত্ব নেয়। জাদুঘরের জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। পরিবারই এই ট্রাস্টের ফান্ড সরবরাহ করে থাকে।
ভাষা আন্দোলনের পথেই বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটেছে মন্তব্য করে ভাষা সৈনিক কাজী গোলাম মাহবুবের কন্যা বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা,সমাজসেবক ও ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের ট্রাস্টি মহুয়া মাহবুব খান বাংলাদেশ মনিটরকে বলেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যে বাঙালি জাতিসত্ত্বার উন্মেষ ঘটেছিল, সেটা এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ, নিথর। তরুণরা বিপথগামী হচ্ছে, নেশাগ্রস্ত হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতি লালন হচ্ছে না। ইংরেজির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ধর্মীয় নানা অপপ্রচারের মধ্যদিয়ে এরা ধর্মান্ধ হচ্ছে। নানানমুখী সাম্প্রদায়িক চেনতায় তারা লালিত হচ্ছে।
তরুণদের পথে আনতে বাঙালি সংস্কৃতির লালন ও পালন করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনকার তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়ে পড়েছে রেডিও-টেলিভিশমুখী। এই চর্চা বন্ধ করে সামাজিকভাবে পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করা দরকার।
দেশের একমাত্র বেসরকারি ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা লিপি মাহবুব জানান, ‘ এটিই দেশে একমাত্র ও প্রথম ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করা কোনো জাদুঘর। তৎকালীন ভাষা আন্দোলনের সময়ের ক্যাপসনসহ দূর্লভসব ছবি সংরক্ষণে রয়েছে এখানে। এটা অসাধারণ। জাদুঘরটির আরো বেশি প্রচার প্রসার হওয়া দরকার।’
-B










