জলবায়ু ঝুঁকিতে বিশ্বের ৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টার


ঢাকাঃ বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের বড় একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার সক্ষমতার প্রায় ৭৯ শতাংশ বন্যা, দাবানল ও তীব্র ঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট স্ট্রিটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের ৯৭টি ডেটা সেন্টার বাজার বিশ্লেষণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক দুর্যোগগুলো ডেটা সেন্টারের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এতে সেবা বন্ধ থাকার পাশাপাশি বীমা ও মেরামত ব্যয়ও বাড়তে পারে।
ফার্স্ট স্ট্রিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ এবি বলেন, ‘এখনো অনেক স্থাবর সম্পদের ঝুঁকি মূল্যায়নে অতীতের তথ্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু জলবায়ুর বর্তমান আচরণ অতীতের ধারা অনুসরণ করছে না। ফলে পুরনো মডেলগুলো ভবিষ্যৎ ঝুঁকির পূর্ণ চিত্র দিতে পারছে না।’
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ডেটা সেন্টার এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু চাপ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও খরা। এসব কারণে অবকাঠামোগুলোর জ্বালানি দক্ষতা কমে যেতে পারে এবং পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো একটি বড় ঝড় বা বন্যা তাৎক্ষণিক ক্ষতি করলেও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে আরো বেশি ক্ষতিকর। কারণ এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে অবকাঠামো, পরিচালন ব্যয় ও ব্যবসার লাভজনকতার ওপর প্রভাব ফেলে।
ফার্স্ট স্ট্রিটের প্রধান অর্থনীতিবিদ জেরেমি পোর্টারের মতে, বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয় না। ফলে প্রকৃত ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রেই কম করে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক সরকারি মডেল এখনো অতীতের বৃষ্টিপাতের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা জমার পরিমাণ বাড়ছে। ফলে বৃষ্টিপাত আরো তীব্র হচ্ছে এবং বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগকারীরা ডেটা সেন্টার নির্মাণের সময় সাধারণ আর্থিক সূচকের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন পরিচালন পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা সবসময় বিবেচনায় নেয়া হয় না। অথচ একটি ডেটা সেন্টার সাধারণত ২০-৩০ বছর পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিলে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার চিহ্নিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ঝুঁকির ভুল মূল্যায়নের সম্ভাবনাও কমবে। তবে শিল্প খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল রিয়েলটি নিজেদের কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু পাওয়ার জানান, বিশ্বজুড়ে তাদের প্রায় ৩০০ ডেটা সেন্টারের অধিকাংশেই পানি ছাড়া পরিচালিত কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পানির অপচয় কমানো সম্ভব হচ্ছে।
জেরেমি পোর্টার বলেন, ‘শুধু ভবনের কাঠামো শক্তিশালী করলেই হবে না। ডেটা সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন অবকাঠামো ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।’
অঞ্চলভেদে ঝুঁকির মাত্রাও ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৮৯ শতাংশ ডেটা সেন্টার জলবায়ু ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। এটি বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে আমেরিকা অঞ্চলে এ হার ৫০ শতাংশ এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলে ৪৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ডেটা সেন্টার খাতের দ্রুতবর্ধনশীল কয়েকটি বাজারও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ভার্জিনিয়া, মালয়েশিয়ার জোহর ও ফ্রান্সের মার্সেই উল্লেখযোগ্য। বিপরীতে নরডিক দেশগুলোর বাজারে জলবায়ু ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম।
পোর্টার বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি ডেটা সেন্টার বাজারের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। এসব অঞ্চলে মূলত বন্যা ও তীব্র বাতাসজনিত ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু চাপের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।’


