বিশ্বজুড়ে অবরুদ্ধ ইরানি এয়ারলাইন্স: সংকটে উড়োজাহাজ খাত


ঢাকাঃ বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় নতুন ও নজিরবিহীন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন, কোনো বিদেশি সংস্থা, বিমানবন্দর বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি ইরানি উড়োজাহাজকে অবতরণ সুবিধা, জ্বালানি সরবরাহ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কিংবা টিকিট বিক্রির সুযোগ দেয়, তবে তাদের মার্কিন ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা হবে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমেরিকার শাস্তির ভয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিমানবন্দর ও সেবা সংস্থাগুলো এখন ইরানি বিমানকে জ্বালানি দেয়া বা ল্যান্ডিং সুবিধা দিতে ইতস্তত করছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ইরানের সব সাধারণ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের আন্তর্জাতিক উড্ডয়ন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বহু বছরের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে তেহরানের বেসামরিক বিমান খাত এমনিতেই ভঙ্গুর। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ইরানের ২৭টি এয়ারলাইন্সের ওপর গণ-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত দেশটির প্রধান তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো—মাহান এয়ার, জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান ইরান এয়ার ও কিশম এয়ার।
ইরানের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে মাহান এয়ারের। ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির ইস্তাম্বুল ও মাসকাট রুট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে চীন, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এদের ফ্লাইট কার্যক্রম রয়েছে
অন্যদিকে ইউরোপীয় রুটগুলো হারিয়ে ইরান এয়ার এখন কেবল নাজাফ, বাগদাদ ও ইস্তাম্বুলে সীমিত পরিসরে কাজ চালাচ্ছে। যুদ্ধে বিমান বহরটির অন্তত ৩০টি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দ্রুতই ইরানি এয়ারলাইন্সগুলোর সচল বহরের এক-তৃতীয়াংশ আচল হয়ে যেতে পারে।
জবাবে ইরানও নিষ্ক্রিয় থাকবে না; তেহরান নিজেদের আকাশসীমা বিদেশি বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক রুটগুলোর ফ্লাইট সময় ও পরিচালনা ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে।
মার্কিন এ সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণের কারণে সব দেশ ওয়াশিংটনের কাছে নতিস্বীকার করবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ পদক্ষেপকে "একতরফা ও অবৈধ" আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে চীন।
মার্কিন হুমকি উপেক্ষা করেই ফ্লাইট পরিচালনা ও সেবা অব্যাহত রাখতে পারে বেইজিং ও মস্কো। ধর্মীয় পর্যটন ও সীমান্ত বাণিজ্যের কারণে ইরাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় চাইতে পারে। পাকিস্তান ও তুরস্কও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এই বিধিনিষেধ এড়ানোর চেষ্টা করবে।
এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন ঘটেছে। দেশটিতে খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয় লাগামহীন। পরিবারগুলোর গড় আয় কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন বিধিনিষেধের ফলে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজের টিকিটের দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাধ্য হয়েই বহু সাধারণ ইরানি এখন হয়ে স্থল ও জলপথে তুরস্ক, ইরাক, আর্মেনিয়া বা পাকিস্তানে গিয়ে সেখান থেকে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরছেন।
এ অতিরিক্ত স্থানান্তরের ফলে ইস্তাম্বুল, দোহা ও দুবাইয়ের মতো উড়োজাহাজ চলাচলের প্রধান হাবগুলো লাভবান হচ্ছে। তবে এতে সাধারণ ইরানি শিক্ষার্থী, চিকিৎসা-প্রার্থী ও অভিবাসীদের ওপর বিশাল আর্থিক ও মানসিক বোঝার সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, খাদ্য, অর্থ ও প্রযুক্তির পর এবার যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাধারণ ইরানিদের বিশ্ব-বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।










