কুয়াকাটা সৈকতে অসহায় পর্যটক: কক্সবাজারে নেই বিদেশি ভ্রমণকারী

ছুটি পেলেই দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক বেরিয়ে পড়েন ছুটি উপভোগে অথচ পর্যটকদের এই ভিড়কে পুঁজি করে খাবার রেঁস্তোরার আবাসিক হোটেলগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। খাবারের দাম দুই-তিনগুন বাড়িয়ে দেয়া হয় আর খালি রুম থাকার পরও পর্যটকদের কাছে রুম নেই বলা হচ্ছে।
অপরদিকে, বাড়তি টাকা প্রস্তাব করলে রুমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগে জানা যায়।
পর্যটকের চাপ দেখলেই হোটেল-মোটেলগুলোর রুম ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ নেওয়া হয়। আর প্রতি হোটেলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসব ভাড়া আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন ঢাকা থেকে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা কোন কোন পর্যটক। তবে এ অভিযোগ সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে ঘিরে বিস্তর।

গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইমন অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) কুয়াকাটায় আসেন। বিভিন্ন হোটেলে রুমের জন্য খোঁজখবর নেন। প্রায় সবাই বলে রুম নেই। তবে কেউ কেউ বলে রুম আছে, কিন্তু বাড়তি টাকা দিতে হবে। একপর্যায়ে সি-বিচ এলাকা বাদ দিয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কলেজ রোডের একটি আবাসিক হোটেলে রাত্রি যাপন করি।
কুয়াকাটায় ভ্রমণে আসা খুলনার কেসিসি রূপসা পাইকারি মৎস্য আড়তের মেসার্স মদিনা ফিস ট্রেডার্সের পরিচালক মো. আবু মুছা গাজী বলেন, কুয়াকাটার ফ্রাই মাছ ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের দেদারছে পকেট কাটছেন। তারা ইচ্ছামতো মাছের দাম নিচ্ছেন। কুয়াটাকায় লইট্টা মাছ ৮০ টাকা পিস, যা খুলনায় বিক্রি হয় কেজি ৭০-৮০ টাকা।
টোনা মাছের কেজি ৪শ টাকা, যা খুলনায় সর্বোচ্চ বিক্রি হয় কেজি ১৫০ টাকা। গাঘরা টেংরা পিস ১২০ টাকা, যা খুলনায় বিক্রি হয় কেজি ১০০-১২০ টাকা। এসব মাছ আবার খুলনায় আসে কুয়াকাটা থেকে।
মামুন নামে এক পর্যটক অভিযোগ করেন, সাগর নামে এক ফটোগ্রাফারে সঙ্গে চুক্তি হয় মামুনের সঙ্গে থাকা বন্ধুদের ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সাগর সেই চুক্তি ভঙ্গ করে বাড়তি টাকা দাবি করে ছবি ডিলেট করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে রোববার (২১ আগস্ট) দুপুরে সোহেল স্টুডিওয়ের ক্যামেরাম্যান সাগর বলেন, আমি কারও সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করিনি। আমি এক হাজার টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা ৮শ টাকা দিতে চেয়েছেন।
বিশেষ বিশেষ সময়ে একই ঘটনা পৃথিবীর দীর্ঘতম অখন্ডিত সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে ঘটে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এ বর্ষায় প্রতিনিয়ত সমুদ্র উত্তাল থাকছে। যে কারণে বর্ষায় কুয়াকাটায় সমুদ্রসৈকতে ছুটছেন ভ্রমণ পিপাসুরা। বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার ছুটির দুই দিনে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে হাজার হাজার পর্যটকদের আগমনে উৎসবমুখর থাকে।
উত্তাল সমুদ্রে গোসল, হই হুল্লোড়, ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আনন্দ উল্লাস ও উম্মাদনায় মেতে ওঠেন দূর-দুরান্ত থেকে আসা নানা বয়সের পর্যটকরা।
উত্তাল সমুদ্র, বিশাল আকারের ঢেউয়ের ভয়কে জয় করে সমুদ্রে সাঁতার কাটা, ওয়াটার বাইকে ঘুরে বেড়ানো, ঢেউয়ের সাথে গাঁ ভাসিয়ে দিয়ে সৈকতে গড়াগড়ি করেন সমুদ্র প্রিয় পর্যটকরা। এমন ছন্দময় সময়কে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই সৈকতের ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তুলেন, কেউ কেউ ছাতার নিচে বসে সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করেন, আবার কেউ ঘোড়ার পিঠে ও মোটরসাইকেলে চড়ে সৈকতের প্রকৃতি উপভোগ করেন।
এমন মোহনীয় পরিবেশে এক শ্রেণীর ফটোগ্রাফার পর্যটকদের ছবি তুলে দেন। পরে ইচ্ছামতো টাকা দাবি করেন। সৈকতে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পর্যটকরা মুগ্ধ হলেও ফটোগ্রাফারদের আচারণে চরম অতিষ্ঠ হন আগত পর্যটকরা। সৈকতের তীরে পাতা বেঞ্চের ভাড়া রাখা হয় দ্বিগুণ থেকে চারগুণও।
আগত পর্যটকদের সন্ধ্যার পর খাবারের প্রধান আকর্ষণ হলো কাঁকড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির ফ্রাই মাছ। সম্প্রতিক সময়ে এসব কাঁকড়া ও মাছের দাম বাড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। একটি মাঝারি সাইজের কাঁকড়া কয়েক মাস আগে যেখানে ৮০ টাকা ছিল। তা এখন ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ইলিশ, কোড়াল, টুনা, লইট্টা ও অক্টোপাসের দামও ইচ্ছামতো নিচ্ছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
পর্যটকদের অভিযোগ, কাঁকড়া ও মাছ ব্যবসায়ীরা জুলুম করছেন। দর কষাকষি করে কোনো লাভ হয় না। বাধ্য হয়ে শখের বসত এসব কাঁকড়া ও মাছ কিনতে হয় বেশি দামে। এছাড়া খাবার হোটেলগুলোতেও ইচ্ছামতো দাম রাখা হয়।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) খালেকুজ্জামার বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ যে কোনো বিষয়ে সহযোগিতা করে ট্যুরিস্ট পুলিশ। চুক্তিভঙ্গকারী ফটোগ্রাফারের পরিচয় ওমোবাইল নাম্বার দিয়ে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সৈকতে পর্যটকদের কাছ থেকে মাছের দাম যেন বেশি নিতে না পারে সেজন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
অবশ্য, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ফটোগ্রাফারদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর টুরিস্ট পুলিশ। পর্যটক হয়রানি বন্ধে সৈকতের ফটোগ্রাফারদের জন্য ১৪ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত একটি মায়াবী ও রূপময়ী সমুদ্র সৈকত। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ এর রূপ পরিবর্তন করে। শীত-বর্ষা-বসন্ত-গ্রীস্ম এমন কোন সীজন নেই সমুদ্র সৈকতের চেহারা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রত্যুষে এক রকম তো মধ্যাহ্নে এর রূপ অন্য রকম। গোধুলি বেলার বীচের হাওয়া-অবস্থা আর রাতের বেলার আবহাওয়া-অবস্থার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই তো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এই সমুদ্র সৈকত এত কদরের, এত পছন্দের।
তবে বিদেশি পর্যটকদের ইদানিং তেমন চোখে না পড়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এখানে সুযোগ সুবিধা তাদের জন্য তেমন কিছুই নেই বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
-B










