আইনি বাধায় আটকা ঐতিহ্যবাহি মহাস্থানগড়ের উন্নয়ন


বগুড়াঃ দেশের প্রাচীনতম প্রত্ননগর ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বগুড়ার মহাস্থানগড় শতাব্দীর পর শতাব্দী ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে আসছে।
প্রতি বছর দেশবিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক, গবেষক ও দর্শনার্থী এখানে এলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তাঁরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে মহাস্থানগড়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দর্শনার্থীবান্ধব উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। ফলে পর্যাপ্ত শৌচাগার, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, বিশ্রামাগার, নিরাপদ চলাচলের পথ, পার্কিং এবং অন্যান্য মৌলিক সুযোগসুবিধার অভাব রয়ে গেছে।
এদিকে সম্প্রতি মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত এলাকায় কিছু উন্নয়নকাজ নিয়ে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় রক্ষণাবেক্ষণ, স্থাপনা নির্মাণ এবং মাটি খনন বন্ধ রাখতে হাই কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার লিভ টু আপিলের শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও প্রধান বিচারপতি বেঞ্চে না বসায় আবেদনটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসেনি বলে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
জানা যায়, হাই কোর্টের আদেশের কারণে মহাস্থানগড় এলাকায় দীর্ঘদিন স্থাপনা নির্মাণ, মাজার সম্প্রসারণ ও খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রয়েছে। তবে সেই আদেশের বিরুদ্ধে চলতি মাসে লিভ টু আপিল করে সরকারপক্ষ।
আপিলে উল্লেখ করা হয়েছে, হাই কোর্টের আদেশের কারণে মহাস্থানগড় এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঐতিহাসিক স্থানটিকে দর্শনার্থীবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পবিত্র ও ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় মসজিদ উন্নয়নে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিলেও আদালতের আদেশের কারণে কাজ শুরু করা যায়নি।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় কাজের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে পরবর্তী সময়ে এ প্রকল্পের জন্য ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। শুরু হয় নারী ইবাদতকারীদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরির কাজ। এদিকে ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়ার জেলা প্রশাসককে চিঠি পাঠিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কাজ বন্ধ করে দেন। এর ঠিক পরপরই সরকারপক্ষ নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল আবেদন করে এবং হাই কোর্টের রায় স্থগিতের অনুরোধ জানায়। এর আগে ১৪ জুলাই লিভ টু আপিল চেম্বার আদালতে উঠলে নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক (অনীক আর হক) এবং রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
এদিকে সরকারের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার কারণে দর্শনার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে আদালতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আইনি প্রক্রিয়া চললেও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ভিন্ন। তাদের দাবি, মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও মূল কাঠামোর কোনো ক্ষতি না করেই আধুনিক পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মহাস্থান মাজার মসজিদের খতিব মাওলানা এমদাদুল হক জানান, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন দুই বিষয় সমন্বয় করেই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বর্তমানে মহাস্থানগড়ে আগত দর্শনার্থীর জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, নারী ও পুরুষের পৃথক স্যানিটেশন-ব্যবস্থা এবং আধুনিক পর্যটনসেবা নেই। এসব কারণে সম্ভাবনাময় এ প্রত্ননগর আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারছে না। এ দাবিতে অতীতেও হাজার হাজার মানুষ মানববন্ধন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই সঙ্গে দর্শনার্থীর প্রয়োজনীয় নাগরিকসুবিধাও সৃষ্টি জরুরি। বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা একটাই-অবহেলা নয়, সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে মহাস্থানগড়কে দেশের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক ঐতিহাসিক পর্যটননগর হিসেবে গড়ে তোলা হোক।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের শেষ দিকে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে হাই কোর্টে একটি রিট করা হয়। ওই রিটে মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট করে স্থাপনা নির্মাণ, মাজার সম্প্রসারণ ও প্রত্নস্থলে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছিল। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্ট ওই রিটের রায়ে এ-সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় অবৈধ দখল প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া প্রত্নস্মারক এলাকার পুবপাশে ২০০ ফুট দূরে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয় রায়ে। পরে মহাস্থানগড়ে দখলসংক্রান্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে এইচআরপিবি পুনরায় আবেদন করলে চলতি বছরের ৫ মার্চ হাই কোর্ট স্থানীয়দের মাটি খনন ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মোতায়েনসহ বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন।
বগুড়া জেলা প্রসাশক তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘বগুড়ার মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের গৌরবময় অতীত ও সংস্কৃতির ধারক। আমরা উন্নয়নও চাই আবার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা হোক সেটাও চাই। আদালত যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই হবে। সরকারকে সব সময় সহযোগিতা করবে বগুড়া জেলা প্রশাসন।’









