ফের পর্যটক সংকটে দুশ্চিন্তায় কলকাতার হোটেল ব্যবসায়ীরা


ঢাকাঃ কলকাতার নিউমার্কেট সংলগ্ন ‘হোটেলপাড়ার’ মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭জন বাংলাদেশিসহ ৯ জন নিহত হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মনে গভীর ভীতি তৈরি হয়েছে।
আতঙ্ক বিরাজ করায় সম্প্রতি তড়িঘড়ি করে কলকাতার হোটেল ছেড়ে দেশে ফিরে যাচ্ছেন বাংলাদেশি অনেক পর্যটক। এমতাবস্থায় হোটেল মালিকরা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
কলকাতার নিউমার্কেট সংলগ্ন সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট তথা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট নিয়ে কলকাতার এই বিখ্যাত 'হোটেলপাড়া' গড়ে উঠেছে। এটি বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে খুবই পরিচিত একটি নাম। এখানে চিকিৎসার প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যটকরা আসার প্রধান কারণ হলো, এই এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে হোটেল বা গেস্টহাউস পাওয়া যায়। তাছাড়া হাতের কাছেই মানি এক্সচেঞ্জ, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার এবং ফুটপাতের নানা ধরনের খাবারের দোকান রয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর এলাকায় আবাসিক ভবনে পরিচালিত হোটেল-গেস্টহাউসের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানামহলে।
অনেক ভবনে একাধিক ছোট হোটেল ও গেস্টহাউস পরিচালনার পাশাপাশি অতিরিক্ত পার্টিশন দিয়ে কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
এসব হোটেলে পর্যটকদের নিরাপত্তার ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
বাংলাদেশি পর্যটক মো. উজ্জ্বল খান জানান, অনেক হোটেলের প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথ এতটাই সরু যে বিপদের সময় দ্রুত বের হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি নিজে হোটেলের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করায় তিনি বেঁচে যান।
এলাকার বেশিরভাগ হোটেলেই ফায়ার এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথ নেই। লোহার সিঁড়ি বানিয়ে দোতলা বা তিনতলায় ওঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া যত্রতত্র বিদ্যুতের তার জোড়া লাগিয়ে এসি ও টিভি চালানো হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কোনো অডিটও অনেক হোটেলে কখনো হয়নি।
বাংলাদেশের যাত্রাবাড়ী থেকে আসা এক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কলকাতার মতো এত বড় শহরে হোটেলের এমন বেহাল দশা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর মতে, হোটেলগুলো প্রচুর টাকা নিলেও তাদের পরিষেবা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সেখানে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই নেই। পুরনো ভবনগুলোতে সিঁড়ি এতই সরু যে একসঙ্গে ২-৩ জন মানুষও ঠিকমতো নামতে পারেন না।
তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় লোকজন পর্যটকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ঠকায় এবং গলা কেটে ফায়দা লোটে। তিনি প্রশাসনকে প্রতিটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানান।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ব্যবসায়ী সমীর দাসও স্বীকার করেন যে, এই ঘটনায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সুবীর নামের এক পর্যটক বলেন যে তাঁদের মনে এখন সত্যি ভয় ঢুকে গেছে। এই ঘটনার পর অনেক পর্যটকই এখন তড়িঘড়ি করে হোটেল ছেড়ে ফিরে যাচ্ছেন।
অবশেষে দুর্ঘটনার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। দুর্ঘটনা কবলিত হোটেলের সামনে ফুল দিয়ে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগ এখন কঠোর ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এই এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলির বৈধতা নিয়ে জোরকদমে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রশাসনের এই আকস্মিক তৎপরতায় অবৈধ হোটেল মালিকরা এখন প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।


