ইনোভেশন ফেয়ারে নজর কাড়ছে সবুজ প্রযুক্তি


ঢাকাঃ রাজধানীর নভোথিয়েটারে ৩ দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬-এর শেষ দিন আজ।
‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই উদ্ভাবন মেলায় দেশের ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন প্রদর্শন করা হচ্ছে। এতে সৌরশক্তিচালিত ৩ চাকার যান ও স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তিগত পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছে।
গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করার নানা প্রযুক্তি স্থান পেয়েছে মেলায়।
আজ মেলার শেষ দিনে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও টেকসই কৃষিবান্ধব প্রযুক্তি ছিল দর্শনার্থীদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে সৌরশক্তিচালিত যান, বৈদ্যুতিক মোটর, স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ দেখা যায় দর্শনার্থীদের মধ্যে।
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন করছে ‘সানকার’ নামে সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি যান। ৩ আসনের এ গাড়িতে ছাদে ৪০০ ওয়াট এবং পেছনে ২০০ ওয়াটের সৌর প্যানেল রয়েছে। ব্যাটারি চার্জ থাকলে এটি প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা চলতে পারে। এর প্রোটোটাইপ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থীরা পুরনো ৪৪০ ভোল্টের ইন্ডাকশন মোটরকে পরিবর্তন করে ৬০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক বাইকের মোটর তৈরি করেছেন। চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প ও ঢাকার ধোলাইখাল থেকে সংগৃহীত পুরনো মোটর ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে তামার কয়েল তৈরি করা হয়েছে। এতে খরচ পড়েছে ১৫ হাজার টাকার কম। উদ্ভাবকদের দাবি, দ্রুত চার্জে প্রায় ৩০ মিনিটে চার্জ হয়ে এটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার চলতে পারে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে রয়েছে ন্যানো-ইউরিয়া, কৃষিতে স্মার্ট সেন্সর, ন্যানো-ক্যারিয়ারভিত্তিক ওষুধ, প্রিবায়োটিক এবং পানি থেকে সরাসরি হাইড্রোজেন উৎপাদনের প্রযুক্তি। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক জৈব ছত্রাকনাশক তৈরি করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এ প্রযুক্তি ব্যবহারে টমেটোর ফলন প্রতি গাছে ৮০ থেকে ৯০টি পর্যন্ত হয়েছে, যেখানে প্রচলিত ব্যবস্থায় ফলন ছিল ৪০ থেকে ৫০টি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি দল মেলায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে স্মার্ট হুইলচেয়ার, নিও সেভার, এআইভিত্তিক ক্যাম্পাস নিরাপত্তা, ব্লিস সিহাত, উচ্চ ভোল্টেজের শক্তিসাশ্রয়ী থ্রিডি প্রিন্টার, ইকোলিংক, এআইভিত্তিক ইসিজি স্ক্রিনিং, ট্রু-সাইট ও আর্বোর আর্থ উল্লেখযোগ্য। স্মার্ট হুইলচেয়ার সেরা ৫০ উদ্ভাবনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টলে রয়েছে সিলিকনভিত্তিক পেরোভস্কাইট সৌরকোষ, ‘অ্যাগ্রিট্রেস বিডি’, ‘কার্বন সেতু’ ও ‘দেশগার্ড এআই’। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন মুখের অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট হুইলচেয়ার, বাংলা প্রোগ্রামিং ভাষা ‘যুক্তি’ এবং ভর্তি ও ওএমআর ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আমার প্রশ্ন’।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ড্রাইভ গার্ড, খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সফটওয়্যার, সবুজ শাকসবজি থেকে তৈরি রুটি, ডুমুরভিত্তিক ডায়াবেটিসবান্ধব খাবার, পাটের আঁশ থেকে উন্নত উপকরণ এবং মেশিন লার্নিংভিত্তিক মনোযোগ ও মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ প্রযুক্তি। পাশাপাশি রয়েছে অফলাইন মোবাইল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রদর্শন করছে ১৫টি উদ্ভাবন ও গবেষণা। অন্যদিকে ড্যাফোডিল এআইয়ের ছয়টি প্রকল্প সেরা ৫০-এ স্থান পেয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক নিরাপত্তা, স্মার্ট অটোমেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আইওটি, রোবটিকস ও অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখানো হয়েছে এসব প্রকল্পে।
আয়োজকদের লক্ষ্য, গবেষক, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের একই প্ল্যাটফর্মে এনে দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাজারমুখী করা। এর মাধ্যমে গবেষণাগার থেকে বাস্তব জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবকদের জন্য নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হবে।



