নেপালে একের পর এক দুর্যোগ, ফের সংকটে পর্যটন


ঢাকাঃ নেপালের পর্যটন খাত গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন মূল মৌসুমে প্রবেশ করছিল, তখনই ‘জেন-জি’ প্রজন্মের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন পুরো খাতকে হঠাৎ স্থবির করে দেয়।
কয়েক বছরের টানা ধাক্কার পর এ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এর আগে নেপালে আঘাত হেনেছিল বিধ্বংসী বন্যা। দুটি বড় বিমান দুর্ঘটনা আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছিল। আর কোভিড-১৯ মহামারি আন্তর্জাতিক পর্যটনকে পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছিল।
সবচেয়ে নাজুক এমন এক সময়েই নেপালে আঘাত হানল আরেকটি নতুন বিপর্যয়।
সম্প্রতি নেপালের রাসুয়া জেলায় ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়ানোর আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিশেষ করে লাভজনক কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রার বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। তীর্থযাত্রীদের নেপাল থেকে তিব্বত যাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ ‘রাসুয়াগড়ি-তিমুরে’এলাকায় এ দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘আমাদের পর্যটন খাত মূলত পাহাড়ের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্যোগ এড়ানো যায়।’
তিনি বলেন , সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ ঘটনা নেপালের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সামনে এক গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির পাহাড়গুলো কি দিন দিন পর্যটকদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?
দুর্যোগের সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ণয়ের কাজ এখনো চলছে। তবে হিমবাহের বিস্ফোরণ (হিমবাহের বরফগলা পানি হঠাৎ নিচে ধেয়ে আসা) এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ যে হিমালয় অঞ্চলের জনবসতি, অবকাঠামো ও পর্যটকদের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে, এ ধ্বংসযজ্ঞ তা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে কাঠমান্ডু উপত্যকায় হওয়া ভয়াবহ বন্যা ছিল নেপালের ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক নগর-বন্যা। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা যায়, গত ৪ দশকের মধ্যে নেপালে ওই সময় সবচেয়ে ভারী বৃষ্টি হয়।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যায় ২৪৯ জন প্রাণ হারান, আহত হন ১৭৭ এবং বাস্তুচ্যুত হয় ১০ হাজারের বেশি পরিবার।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ ঘটনা নেপালের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সামনে এক গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির পাহাড়গুলো কি দিন দিন পর্যটকদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?
দুটি বড় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনাও নেপালের পর্যটন খাতকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পোখারায় অবতরণের সময় ইয়েতি এয়ারলাইনসের একটি এটিআর-৭২ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৬৮ জন যাত্রী ও ৪ ক্রুর সবাই নিহত হন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই শৌর্য এয়ারলাইনসের একটি বোম্বার্ডিয়ার সিআরজে-২০০ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১৮ জন নিহত হন।
কোভিড-১৯ মহামারির নজিরবিহীন ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই এসব দুর্যোগ দেখা দেয়। মহামারি নেপালের পর্যটনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল।
এ খাত যখনই একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, তখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়।
এখন রাসুয়ার দুর্যোগ আরেক দফা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এ বিপর্যয় সরাসরি নেপালের পাহাড়ি পরিবেশের নাজুক অবস্থার সঙ্গে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা নেপালের ৪২টি হিমবাহ হ্রদকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হিমালয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বরফ গলার কারণে এগুলো যেকোনো সময় ফেটে পড়তে পারে। এসব হ্রদের বেশির ভাগই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা এভারেস্ট অঞ্চলে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং হিমালয়ের হ্রদগুলোর আয়তন বাড়ছে। হ্রদগুলো বড় হতে থাকায় এদের দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধগুলো ভেঙে পড়তে পারে। ফলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর-কাদা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। এতে ভেসে যেতে পারে লোকালয়, রাস্তাঘাট, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পর্যটন অবকাঠামো।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং হিমালয়ের হ্রদগুলোর আয়তন বাড়ছে। হ্রদগুলো বড় হতে থাকায় এদের দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধগুলো ভেঙে পড়তে পারে। ফলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর-কাদা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক। এতে ভেসে যেতে পারে লোকালয়, রাস্তাঘাট, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও পর্যটন অবকাঠামো।
বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। তা সত্ত্বেও নাজুক পাহাড়ি প্রতিবেশ ব্যবস্থার কারণে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ দুর্যোগ একটি জোরাল প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। এ তহবিল নেপালের পর্যটনকে টেকসই করতে পারে। তা না হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে এবং মানুষ মরতেই থাকবে।
নেপালের পর্যটনশিল্প অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, মহামারি ও বিক্ষোভ মোকাবিলা করে টিকে থেকেছে।
কিন্তু হিমালয়ের উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নেপাল এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে খোদ প্রকৃতিই পর্যটনের সামনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন সবকিছুকে বদলে দিচ্ছে, আর নেপালের পক্ষে একে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।’
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বারবার সতর্ক করে বলেছে, তীব্র জলবায়ু ঝুঁকি নেপালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় বাধা। কারণ, বিশেষ করে পর্যটন ও কৃষিতে এই ঝুঁকির মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।










