পর্যটনের টানে বদলে যাচ্ছে পাহাড়


খাগড়াছড়ি: সবুজ পাহাড়, ঝরণা, মেঘের লুকোচুরি, বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, খাবার ও জীবনযাত্রার কারণে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ি।
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক, রিছাং ঝরণা ও মায়াবিনী লেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে পর্যটকের ভিড় বাড়ে।
পর্যটকের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জেলায় গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্পের ব্যবসা। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটন এখন স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই গাইড, চালক, হোটেলকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় পণ্য বিক্রেতা হিসেবে আয় করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে জেলার অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান আরও বাড়বে এবং বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
পর্যটকদের ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। আবাসন, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ফলমূল, পাহাড়ি খাবার ও হস্তশিল্পের বিক্রির মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারাও উপকৃত হচ্ছেন। পর্যটনকে কেন্দ্র করে ছোট দোকান, চায়ের স্টল ও নানা ক্ষুদ্র উদ্যোগও গড়ে উঠছে।
তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পেলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব কমে যেতে পারে। এজন্য তারা পর্যটন ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচার ও বাধা সৃষ্টি করছে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি, অধিকার ও পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রায় ১৫ একর আয়তনের মায়াবিনী লেক পর্যটন সম্ভাবনার একটি সফল উদাহরণ। এখানে মাছ চাষ, ফলের বাগান, প্যাডেল বোট ও অন্যান্য বিনোদনসুবিধার মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় শ্রম, পণ্য ও উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এমন আরও প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে পর্যটনের সুফল আরও বিস্তৃত হবে।
আবাসন খাতেও পরিবর্তন এসেছে। খাগড়াছড়িতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হোটেল-মোটেল গড়ে উঠলেও পর্যটকদের জন্য মানসম্মত আবাসন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, চিকিৎসা, তথ্যসেবা ও জরুরি সহায়তা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
পর্যটকদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিনোদনসুবিধা বাড়ানো দরকার। কেবল কার, চেয়ারলিফট, জিপলাইন, পর্যটন ট্রেন, এটিভি রাইডসহ কিছু আধুনিক রাইড চালু করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। পাশাপাশি বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানকে যুক্ত করে ট্যুরিজম সার্কিট এবং একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্য ও বুকিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলারও প্রস্তাব রয়েছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। জেলা পরিষদের মাধ্যমে কেবল কার স্থাপনের পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খাগড়াছড়ির পর্যটন উন্নয়নে বিনিয়োগের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, সংস্কৃতির প্রতি সম্মান ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পাহাড়-ঝরণা সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের জন্য কার্যকর আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি।
তাদের মতে, পর্যটনের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষ যদি টেকসই আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি গড়ে তুলবে। সুষম পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে খাগড়াছড়ি দেশের টেকসই পর্যটন অর্থনীতির একটি সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে।
- জাফর আলম, কক্সবাজার










