বাংলাদেশে বিমান ভ্রমণের খরচ বাড়তে পারে


ঢাকা: বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এয়ারলাইনস, যাত্রী এবং উড়োজাহাজ চলাচলসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রস্তাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চার্জ সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবে উড়োজাহাজের অবতরণ চার্জ, প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার, রুট নেভিগেশন সুবিধা, যাত্রী এমবার্কেশন ফি এবং বিমানবন্দরের নির্ধারিত পরিচালন সময়ের বাইরে সেবা গ্রহণসহ বিভিন্ন খাতের চার্জ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ যাত্রীদের ওপরও পড়তে পারে। বাড়তে পারে বিমানভাড়া ও ভ্রমণসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ।
বেবিচকের তৈরি অ্যারোনটিক্যাল ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট চার্জ পর্যালোচনা এবং পুনর্নির্ধারণবিষয়ক একটি উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে অধিকাংশ বিদ্যমান চার্জ অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিদ্যমান হারগুলো ১৯৮৪ সালের সিভিল এভিয়েশন রুলস অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বড় ধরনের সংশোধন করা হয়েছিল প্রায় ২২ বছর বিরতির পর।
যেসব চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব
প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ফ্লাইটের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের বিভিন্ন ওজন শ্রেণিতে অবতরণ চার্জ ২৫ শতাংশ বাড়ানো হবে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ১০ টন পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের বর্তমান অবতরণ চার্জ ৫২.৫০ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬৫.৬০ ডলার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০ থেকে ৫০ টন ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে বর্তমান ১৫০ থেকে ৩৭৫ ডলারের চার্জ বাড়িয়ে ১৮৮ থেকে ৪৬৯ ডলার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। উড়োজাহাজের ওজন অনুযায়ী এ হার কার্যকর হবে।
অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও অবতরণ চার্জ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ১০ টন পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের অবতরণ চার্জ প্রতি ১ হাজার কেজিতে ৫৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৬.২৫ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এইচএসআইএ) তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া অন্যান্য বিমানবন্দরে প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের চার্জও ২৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১০০ টনের কম ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রথম দুই ঘণ্টার জন্য বর্তমান ১০০ ডলারের চার্জ বাড়িয়ে ১২৫ ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে। ৩০০ টন বা তার বেশি ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এ চার্জ ২৫০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩১২.৫০ ডলার নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের আকাশপথে নেভিগেশন সুবিধা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজের জন্য প্রযোজ্য রুট নেভিগেশন ফ্যাসিলিটি চার্জ (আরএনএফসি) ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ২ হাজার কেজি পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের চার্জ ১২ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৩.২০ ডলার এবং ২০০ টনের বেশি ওজনের উড়োজাহাজের চার্জ ৪৫০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪৯৫ ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে।
যেসব বিমানবন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে না, সেসব বিমানবন্দরে নির্ধারিত পরিচালন সময়ের বাইরে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রেও বাড়তি চার্জ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর ও অ্যারোড্রোম সুবিধা ব্যবহারের চার্জ প্রতি ঘণ্টা বা ঘণ্টার অংশবিশেষের জন্য ২২৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৮৫ ডলার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে একই চার্জ প্রতি ঘণ্টায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
নির্ধারিত পরিচালন সময়ের বাইরে এয়ার রুট নেভিগেশন সুবিধা ব্যবহারের চার্জও প্রতি ঘণ্টায় ৯০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১১৫ ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে।
বাড়ছে যাত্রী এমবার্কেশন ফি
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দর ব্যবহারের খরচও বাড়তে পারে।
হযরত শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া অন্যান্য টার্মিনালের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীপ্রতি বিদ্যমান ৫০০ টাকা এমবার্কেশন ফি পরিবর্তন করে ৬ ডলার নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বর্তমান ২৫ টাকার এমবার্কেশন ফি বাড়িয়ে ১০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালের জন্য যাত্রীপ্রতি ১২.৫০ ডলার এমবার্কেশন ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব চার্জ বিমান টিকিটের মূল্যের পাশাপাশি অন্যান্য প্রযোজ্য কর ও ফি-এর অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করা হবে। ফলে বিমান ভ্রমণের সামগ্রিক ব্যয় বাড়বে।
হেলিকপ্টার পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য হারে চার্জ বৃদ্ধি
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে হেলিকপ্টার অবতরণ চার্জও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে ২ হাজার কেজির কম ওজনের হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে অবতরণ, রুট নেভিগেশন ও নিরাপত্তা চার্জ মিলিয়ে প্রতি অবতরণে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। অন্যদিকে, ২ হাজার কেজির বেশি ওজনের হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে এ চার্জ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ৩ হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ৫০ মার্কিন ডলার চার্জ চালুর কথা বলা হয়েছে।
চার্জ বাড়ানোর পক্ষে বেবিচকের যুক্তি
বিদ্যমান চার্জ পুনর্নির্ধারণের প্রধান কারণ হিসেবে পরিচালন ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বেবিচক।
সংস্থাটির উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেবিচকের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেবিচকের মোট রাজস্বের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ থেকে।
বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নেও বিপুল বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, ট্যাক্সিওয়ে, নতুন কার্গো ভিলেজ এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরের রানওয়ে, অ্যাপ্রোন ও টার্মিনাল সুবিধার উন্নয়ন।
এ ছাড়া রাডার, ভিওআর, ডিএমই ও আইএলএস ব্যবস্থাসহ কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স/এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (সিএনএস/এটিএম) সুবিধার আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণেও বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে নির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের আর্থিক দায়ও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বেবিচকের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে বার্ষিক প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বেবিচকের আরও যুক্তি, বাংলাদেশের বিদ্যমান কিছু চার্জ, বিশেষ করে উড়োজাহাজ অবতরণ চার্জ এবং যাত্রীসেবা বা এমবার্কেশন ফি, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় এখনো কম।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শের ওপর গুরুত্বারোপ
বেবিচক চার্জ বাড়ানোর পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরলেও প্রস্তাবিত এ বৃদ্ধি এয়ারলাইনস, ট্রাভেল এজেন্ট, বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং উড়োজাহাজ চলাচল খাতের অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। কারণ, এ সিদ্ধান্ত দেশের বিমান পরিবহন বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বেবিচকের উপস্থাপনাতেই আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) বিমানবন্দর ও এয়ার নেভিগেশন সার্ভিস চার্জসংক্রান্ত সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব সুপারিশে ৪টি মৌলিক নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—বৈষম্যহীনতা, ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য, স্বচ্ছতা এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে পরামর্শ।
আইকাওর নির্দেশনা অনুযায়ী, চার্জ সংশোধন বা নতুন চার্জ আরোপের পরিকল্পনা করা হলে সাধারণত ব্যবহারকারী বা তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোকে অন্তত ৪ মাস আগে জানাতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও পরিচালনসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের মতামত দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
বেবিচকের কমিটি তার সুপারিশে উড়োজাহাজ অবতরণ চার্জ, প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের চার্জ (এইচএসআইএর তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া) এবং নির্ধারিত সময়ের বাইরে ফ্লাইট পরিচালনার চার্জ সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি রুট নেভিগেশন ফ্যাসিলিটি চার্জ ১০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ওভারফ্লাইট চার্জ থেকে পাওয়া রাজস্ব এইচএসআইএর হিসাব থেকে বেবিচকের সদর দপ্তরের হিসাবে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বেবিচকের অবকাঠামো ব্যবহারকারী কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কার্গো ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতাদের কাছ থেকে রয়্যালটি আদায়ের ব্যবস্থাও চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের সম্প্রসারিত অ্যাপ্রোনে স্থাপিত হাইড্র্যান্ট রিফুয়েলিং অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়্যালটি আদায়ের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হয় কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিমান চলাচল খাত।
প্রস্তাবিত চার্জ অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের ব্যয় কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এর প্রভাব শুধু এয়ারলাইনসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যাত্রী, কার্গো পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পেও পড়বে।










